মৃত্তিকা : একাদশ সংখ্যা

সূূচীপত্র

মুখবন্ধ

সাধারণ অর্থে স্মৃতি বলতে কী বুঝি? অতীত থেকে বয়ে আনা কোনো স্রোত যা আজকের প্রবাহের সঙ্গে মিশে গেলেও যেন আজকের রঙে রাঙাচ্ছে না নিজেকে। বরং সে বয়ে এনেছে নিজস্ব পুরোনো রঙ, টেনে এনেছে পুরাকালের অস্তিত্ব। ধরে নেওয়া হয় শ্রুতি আর স্মৃতির মধ্যে শ্রুতি শ্রেয়তর, যেহেতু তা উৎপত্তির অভিমুখের দিকেই ধাবিত। অন্যদিকে স্মৃতি বিভিন্ন বিশ্লেষণে মিশে অনেকটাই কলুষিত। 

ইংরেজি শব্দ মেমোরি আর ভারতীয় শব্দ স্মৃতি দুই আপাতভাবে একরকম লাগলেও এক না। পশ্চিমী শিক্ষাধারা মানতে শিখিয়েছে তথ্য, তাই স্মৃতি বললেই ভাবি যেসব ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে পড়ে, তাই স্মৃতি। ঘটে যাওয়া ঘটনাকে মানতে শিখেছি ইতিহাস বলে; যদিও এখানেও পশ্চিমী আর ভারতীয় ইতিহাসবোধের বিস্তর তফাৎ। ভারতীয় মননে ইতিহাস জয় পরাজয়ের ডকুমেন্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, ভারতবর্ষের একটি ‘স্বাভাবিক ইতিহাস’ হল মহাভারত। তাই আমাদের সেই অর্থে ‘ইতিহাস’ নেই, আছে ঘটনার মহাকাব্যিক বিশ্লেষণ। তাই আমাদের কাছে স্মৃতি কেবল ঘটনা মনে করা নয়, স্মৃতি একটা ভাবনা এবং তা অতীতের কথা বয়ে আনলেও, আদতে অতীতের থেকে ঢের বেশি তার দৃষ্টি বর্তমানের ওপর। ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান, এই ত্রিকালের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে জীবিত ও উপেক্ষিত থাকে কেবল একটি কাল, বর্তমান। অতীত মৃত ও ভবিষ্যৎ অজাত। যে স্মৃতি বর্তমান, তা আদতে আমারই বর্তমান মনন। এমনকী আমাদের স্মৃতি এমন অনেক কিছু দিয়েই গড়া যা ঘটেনি, যা কেবল অনুভূত বা অনুমিত। তাই স্মৃতি শুধু বয়ে আনা কালের ধারা নয় স্মৃতি এক নির্মাণকাজও বটে। কিছু স্মৃতি মুছে মুছে যায় কালের সঙ্গে কিছু ফিরে ফিরে আসে। কিছু থেকে যায় দুপুরের চিলেকোঠা হয়ে, কিছু জাগিয়ে রাখে কানাগলির অন্ধকার। স্মৃতিচারণ তাই কেবল ফেলে আসা সুদিনের কথা ভেবে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলা নয়, বরং বর্তমানকে কলুষমুক্ত করার দিকে প্রাথমিক প্রচেষ্টা। 

অভিষেক ব্যানার্জী

আমার ছোটোবেলার তেপান্তর

চুঁচুড়া শহরের পূর্বদিক দিয়ে মহাধমনীর মতো বয়ে গেছে হুগলী নদী। আর তার পাশেই রয়েছে এই শহরের ফুসফুস, চারটি মাঠ, আমাদের শ্বাস নেওয়ার জায়গা। একেবারে ছোটোবেলা থেকেই এই মাঠের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক। আমার বাড়ি থেকে চুঁচুড়া ডাফ স্কুল পেরিয়েই প্রথম যে মাঠ, যা গোর্খা ময়দান বলেই সবাই চেনে, তার সাথেই এই আত্মীয়তা  সবচাইতে বেশি। পাশের বাড়ির মামিমার কোলে চেপে প্রতিদিন বিকেলে যখন আমি এই মাঠে যাওয়া শুরু করি, তখনও আমার মুখে কথা ফোটেনি, হাঁটতে চলতেও শিখিনি। বয়স্ক জেঠিমা-মাসিমাদের একটা দল ছিল যাঁরা প্রতিদিন অন্নপূর্ণা মন্দিরের দালানে গোল করে বসে গান করতেন – “ভব সাগর তারণ কারণ হে”- আর আমি তাঁদের মাঝে শুয়ে থাকতাম। এই মাঠেই প্রথম শিশিরভেজা ঘাসে পা দিয়েছি, প্রথমবার দৌড়াতে শিখেছি। মন্দিরের পাশে দুটো বিশাল অশ্বত্থগাছের গায়ে ছিল চওড়া গোল বেদি। যখন একটু বড়ো হলাম, তখন কচিকাঁচা দাদা-দিদি মিলে সেই চাতালে ছোটাছুটি করা ছিল আমাদের প্রধান খেলা। আর ছিল একটা হাতি, একটা শামুক আর একটা কচ্ছপ — সবই সিমেন্টের, তাও আমাদের কাছে জীবন্ত। তাদের উপর চড়া ছিল আরেক খেলা। হাতির পিঠ থেকে নেমে এসেছে  ‘স্লিপ’। তখনই প্রথম আলাপ হল পাখি, কাঠবেড়ালির সাথে। অবাক বিস্ময়ে প্রথম দেখলাম আমার হাতের রেখার মতোই গাছের পাতার শিরা উপশিরা। সেই বিশাল গাছদুটোর বেদির মধ্যে প্রায় ফুট তিনেকের এক ব্যবধান ছিল। যারা লাফিয়ে সেটা পার করতে পারত, দলে তারা আর ছোটো থাকত না, প্রকৃত অর্থে ‘দাদা-দিদি’ হয়ে উঠত। শিশু থেকে কিশোর হওয়ার যেন এক শর্ত ছিল সেই লাফে সফল হওয়া। কৈশোর লাভ করে ক্রমে সেই খেলার দল বদলে গেল। শুরু হল ক্রিকেট, ফুটবল — সেসময়ে তখনও যা শুধু ছেলেদের খেলা। তাই নতুন বন্ধুর দল হল, পায়েল, মাম্পী দিদিদের সাথে কেমন একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। বয়স কম থাকায় ক্রিকেটের দলেও বল কুড়ানো ছাড়া কোনোকিছু করার সুযোগ পেতাম না। মনখারাপ করে বসে থাকতাম। অথচ মাঠে যাব না কোনোদিন মনে হয়নি। এমনই এক টান ছিল যে বর্ষার দিনেও ছাতা, রেনকোট নিয়ে মাঠে যেতাম। একদিন কোথা থেকে এক সম্পূর্ন অচেনা দাদা এসে হাত ধরে ব্যাট করা শেখাল, খেলোয়াড় হিসেবে শুরু হলো নতুন ইনিংস। তখন এই এক মাঠ থেকে পাশের মাঠে খেলতে যাওয়া ছিল দেশ জয় করতে যাওয়ার মতো। দুপুর থাকতে উইকেট পুঁতে আসতে হত মাঝের ক্রিকেট পিচে। মনে অদ্ভুত উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ নিয়ে একদল সৈনিক ব্যাট-বল যাবতীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এমাঠ থেকে ওমাঠে যেত যুদ্ধজয়ের আশায়। 

আমাদের নিজের এই গোর্খা ময়দানে একবার বাসস্ট্যান্ড হয়ে গেল। তাতে মনে হয়েছিল, কেউ যেন হাত-পা বেঁধে আমাকেই ওই বাসের চাকার তলায় ফেলে দিয়েছে। পরে মাঠ আবার ফেরত পেয়েছিলাম, কিন্তু তাতে আর ঘাস ছিল না। আর এখন তো সেখানে একটা বিল্ডিং মাথা তুলেছে। নামে স্টেডিয়াম হলেও কোনোদিন সেখানে কোনো খেলা হতে দেখিনি। ঘেরাটোপে বাঁধা পড়ে আছে আমার ছোটোবেলার মাঠ। মনে হয় আর কোনোদিন তাকে ফেরত পাব না, যেমন পাব না আমার ছোটোবেলাকে।

অরিন্দম মুখার্জী

নিবিড় সুখে মধুর দুখে

অনেক কালের যাত্রা আমার

 অনেক দূরের পথে,

প্রথম বাহির হয়েছিলেম 

প্রথম-আলোর রথে 

গ্রহে তারায় বেঁকে বেঁকে 

পথের চিহ্ন এলেম এঁকে

কত যে লোক লোকান্তরের 

অরণ্যে পর্বতে। 

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) 

এই লেখা পড়তে পড়তে  এক  মনকেমনের জ্যোৎস্না ঢেউ খেলে ওঠে, মনে হয় ওই তো আমার কত দিনের হারানো মৃন্ময় কবচকুন্ডল, এই যে আমার চিরন্তন গম্যতা, তার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকে অজস্র শতদল, তার কোথাও পুষ্পগন্ধের নিরবিচ্ছিন্ন সুঘ্রাণ আবার কোথাও বিবর্ণ আকাশ। যাপনের প্রতিটি বিন্দু জুড়ে জুড়ে গেঁথে নিই স্মৃতির মণিহার।   

ভোরের রেডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে হেমন্ত মুখার্জীর গান “তুই ফেলে এসেছিস কারে মন মন রে আমার…” আমার পল্লব ঘেরা এক চিলতে বাসার এক কোণে সিলেবাসের অলিন্দ থেকে আমিও  চুরি করে দেখে নিই এক চিলতে আকাশ…  

চুড়ির আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্রসংগীত, কখনো হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কখনো দেবব্রত বিশ্বাস অথবা নীলিমা সেন গাইছেন — “কী রাগিনী বাজালে হৃদয়ে, মোহন, মনমোহন…” পৃথিবীর প্রায় সমস্ত পুরুষের মতো আমরাও কখনো বুঝতে চাইনি, ধরতে চাইনি মায়ের হৃদয়ের গভীরে সেই মোহনবাঁশির কথা। শুধু মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম সেই মুরলির অন্তরালে রান্নাঘরের ভ্যাপসা বাতাসের গহন থেকে আমাদের লাঞ্চ ডিনার ব্রেকফাস্ট-এর সঙ্গে ভেসে আসছে মায়ের গলা, “সে ঢেউয়ের মতন ভেসে গেছে, চাঁদের আলোর দেশে গেছে …তাই আপন-মনে বসে আছি কুসুমবনেতে”। কন্ঠ থেকে এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে পড়ত। সত্যিই তো এই নিঃসঙ্গ  আত্মদহনের চরাচরব্যাপী সাম্রাজ্যে ওই ‘কুসুমবন’টিই আমার একান্ত আশ্রয়স্থল। আমাকে দ্রাবিত করে প্রস্ফুটিত করে ওই স্মৃতিবিন্দুগুলি। সহস্র সংবেদী স্মৃতির অবগুন্ঠন ভেদ করে বেঁচে থাকে আজন্ম। আমাকে আত্মবিস্মরণ থেকে জাগিয়ে রাখে।  

রবীন্দ্রনাথ লিখছেন 

“স্মৃতির পথে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানিনা কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ যাহা কিছু ঘটিতেছে তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই সে আপনার অভিরুচি অনুসারে কত কী বাদ দেয় কত কী রাখে।  কত বড়কে ছোটো করে ছোটোকে বড় করিয়া তোলে।  সে আগের জিনিসটি পাছে ও পাছের  জিনিসকে আগে সাজাইতে কিছু মাত্র দ্বিধা করেনা। বস্তুত তাহার কাজই ছবি আঁকা ,ইতিহাস লেখা নয়।”  

সমস্ত অন্তর্দহনের অভিমুখ এক লহমায় বহির্দহনে বহিয়ে দিতে পারে আমার স্মৃতিতরঙ্গ।  আমার ক্ষণ ক্ষৌণি জীবনের প্রতিটি বৃন্তে সে জন্ম নিচ্ছে, সে জেগে উঠছে। আমার  প্রাত্যহিক এষণা, প্রাত্যহিক বঞ্চনা,পরস্পর-বিরোধী মন, সাজানো পারিপাট্য, শেষ না হওয়া কবিতা-গুচ্ছ, ষ্টেশনের ফ্লাইওভার-এর নীচে দাঁড়ানো নিষিদ্ধ অলকা, কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো মাষ্টারমশাই, খদ্দর-পরা চশমা-আঁটা দিদিমণি, কিশোর-কন্ঠী রিক্সাওয়ালা …“আমি চিনি গো চিনি তোমারে”… সবকিছুকে আবর্তন করে রচনা  করছে  আমার জীবনবোধের প্রেক্ষাপট। আমার বারে বারে ফুরিয়ে যাওয়া প্রাণশক্তিকে অর্পণ করছে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ।

অরুন্ধতী চন্দ

বকুলের বাসা

২০২৬ এর শুরুতে ‘স্মৃতি’ শব্দটি কলমে ছোঁয়াতেই, আমার মনে একগুচ্ছ প্রশ্ন দানা বাঁধল। স্মৃতি কি খুব দামি?, গরীব ও বড়োলোকের স্মৃতির মূল্যায়ন যদি হয় তাহলে তার পার্থক্য কতটা?, স্মৃতি কি মানুষের পিছুটান বাড়ায় না কি সামনের পথ চলতে আরও বেশি সাহস দেয়? স্মৃতি আমাদের গড়ে না ভাঙে? এইসব প্রশ্নের ঘূর্ণিতে আমার মস্তিষ্ক ও মন যখন ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন দুই দশক পূর্বের একটি ‘স্মৃতি’ পরিস্ফুট হতে চাইছিল। হয়ত এই লেখাটি প্রকাশিত হলে, সেই স্মৃতির  আত্মপ্রকাশ ঘটবে যা আমার স্মৃতির ঘরে যত্ন করে তোলা ছিল । 

আমার বেড়ে ওঠার একটি বৃহত্তম অংশ ছিল একান্নবর্তী পরিবারে। সেই পরিবারের গার্হস্থ্য কাজের সহায়িকা ছিলেন বকুলবালা মাসি। দেশভাগের সময়, বরিশাল ছেড়ে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল উত্তর চব্বিশ পরগনার একটি রেফিউজি ক্যাম্পে। কালের নিয়মে মাসির বাসস্থান হয় খড়দহ এলাকায়, আমার পৈতৃক ভিটের অঞ্চলে। আমার ঠাকুমা (জন্মস্থান বরিশাল) ছিলেন সংসারের প্রধান। শুনেছিলাম, উনি ভোটার কার্ডের চেয়ে বেশি ‘বরিশাল’-এর উপর নির্ভর করে বকুলবালাকে কাজে  নিয়োগ করেছিলেন। বরিশাল বাংলাদেশের কীর্তনখোলা নদীর সংলগ্ন একটি শহর। বকুলমাসি ভারি মিষ্টি একটি উপভাষাতে কথা বলতেন — ‘বরিশাইলা বাঙ্গাল’। এই উপভাষাটির মধ্যে মাটির ঘ্রাণ অনুভব করতাম। ভারি মজার লাগত মাসির সাথে টুকরো টুকরো কথোপকথন। 

বকুলমাসি ভারি আন্তরিক ভাবেই মা ও আমায় নিজের বাড়িতে একদিন আমন্ত্রণ করেছিলেন। রেল লাইনের ধার লাগোয়া বকুলমাসির বাড়ি। টালির চাল, বেড়ার দেওয়াল, কিছুক্ষণ অন্তর বাড়ির জমি কেঁপে ওঠে ট্রেন চলাচলের ফলে। ঘরে প্রবেশ করতেই আরেকটি অনুনাদ সারা শরীরে বোধ করেছিলাম ।

আমাদের পরিবারের ব্যবহৃত ও বর্জন করে দেওয়া সমস্ত আসবাব দিয়ে গোছানো মাসির ছোট্ট ‘বাসা’, বাড়ি বোঝাতে মাসি এই ‘বাসা’ কথাটি বলতেন। ঠাকুর সিংহাসন, মিটকেস, বসার টুল, কাঁচের গ্লাসের সেট, তোশক, বিছানার চাদর, চায়ের ট্রে, দেওয়ালে টাঙানো ফোটো ফ্রেম —- যে দিকেই নজর যাচ্ছে  নতুনের কোনো চিহ্ন নেই । অথচ এই জিনিসগুলো আমি কত অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখেছি আমার বাড়িতে।

নিপুণ হাতে পরিপাটি করে সযত্নে সাজানো বকুলবালার সংসার। মাসি যত উৎসাহ নিয়ে আমাদের সবটা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন, ততটা উৎসাহ আমার বুকের মধ্যেখানে অনুভব করতে পারছিলাম না। আমার ভেতরটা কেমন যেন একটা সাংঘাতিক, তীব্র তিতকুটে বিরক্তিতে গ্রাস করছিল । অসম্ভব ছোটো লাগছিল নিজেকে, সেই কিশোরী বয়সে। বাড়ি ফিরেছিলাম একরাশ গ্লানির মেঘ নিয়ে ।

এই স্মৃতিটি আমায় প্রায়শই দগ্ধ করত, এখনো করে । স্বাভাবিকভাবেই সভ্য শিক্ষিত সমাজ একে দারিদ্রের খাতায় চিহ্নিত করেছে । এত প্রযুক্তির উন্নতিকরণ, দেশের অগ্রসর হওয়ার গ্লোবাল রিপোর্ট, জিডিপির বড়াই-এর মাঝে, এখনো কত ‘বকুলবালার বাসা’ সাজানো অন্যের ব্যবহৃত জিনিস দিয়ে । এরই কি নাম ‘সাস্টেনিবিলিটি’ নাকি ‘রিসাইক্লিং’ নাকি অন্যকিছু?! এমন কিছু যা আমাদের চেয়ে আর্থিকভাবে নীচু স্তরের মানুষদের কাছে দয়ার অবতার করে তোলে আমাদের ! এই ‘বকুলবালা’রা  কি নারী স্বাধীনতা, স্বনির্ভরতার প্রতীক নাকি দারিদ্র থেকে সৃষ্টি হওয়া শিক্ষিত সমাজের দাস? আমরা প্রতিনিয়ত তাঁদের ব্যবহার করে চলেছি, কিছু সামান্য অর্থের বিনিময়ে, যেখানে না আছে কাজের সুরক্ষা, না কোনো অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা ।  

স্মৃতি বড়ো বিলাসিতার অনুভূতি, এইসময়কালীন জীবনধারায় , স্মৃতি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার অবকাশ প্রায়শই হয়ে থাকে এমনটা বলতে পারবনা । তবে স্মৃতি শব্দটি এখন আমাকে বেশ ভাবিয়ে তোলে, নিয়ে যায়না কোনো সুন্দর, ফুরফুরে সীমাহীন দিগন্তে ।  

আশিস রায়

স্মৃতির মস্করা

 স্মৃতি বড়োই মস্করাপ্রবণ। অনেক সময় জরুরি কোনো কথা বা আলোড়ন তোলা ঘটনা, প্রভাবিত হওয়ার মতো কিছু কাজ বা পরিচিত কারোর নাম আমাদের মনে পড়ে না। আবার তুচ্ছ, অকিঞ্চিৎকর অনেক ঘটনাই আমরা মনে করতে পারি অনায়াসে।     

                    স্মৃতির আরেকটি বদমায়েশি হল প্রয়োজনের সময় কাজটি বা কথাটি মনে না পড়া। আমার নিজের ক্ষেত্রে দেখেছি বহুবার পড়া কোনো একটি কবিতা যা কিনা বেশ কিছুদিন যাবৎ শ্রোতাদের শুনিয়ে আসছি,  হঠাৎই একদিন অনুষ্ঠান চলাকালীন তার কোনো একটি লাইন মনে পড়তেই চাইল না। তেমনই,  যে সংলাপ সম্পূর্ণ মুখস্থ, বেশ কয়েকবার মঞ্চে চরিত্রটি অভিনয় করেছি, সেই জানা সংলাপটি হঠাৎ একদিন অভিনয়ের সময় স্মৃতি থেকে মুছে গেল। কী বিড়ম্বনায়  যে পড়তে হয় তখন তা কেবলমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন । তখন এক একটি মুহূর্ত মনে হয় যেন কত দীর্ঘ। 

                      স্মৃতির আর একটি মস্করার কথা বলি। পরীক্ষার ঠিক আগে হলে ঢুকে মনে হল কোনো পড়াই মনে পড়ছে না। সব ভুলে গেছি। কোনো প্রশ্নেরই উত্তর লিখতে পারব না। মন আনচান করা অবস্থায় এক স্নেহশীল অধ্যাপক বললেন, “হলে গিয়ে বসলে এবং প্রশ্নপত্র হাতে পেলে দেখবে সব মনে পড়ে যাচ্ছে”। অগত্যা তাই করা গেল। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে দেখলাম সবটাই মনে করতে পারছি। তখন আর স্মৃতি প্রতারণা  করছে না।     

                        আর একটি ঘটনার কথা বলি। অনেক বছর আগে স্ত্রী কন্যা সমভিব্যাহারে গিয়েছিলাম কেদারনাথ। শেষ বিকেলে পৌঁছোলাম গৌরীকুণ্ডে। পরের দিন সকালেই কেদারনাথ যাওয়া হবে। সেখানে বেশ কয়েকজন ভ্রমণার্থী আমাদের নিরুৎসাহিত করলেন—ওখানে এখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত তুষারপাত হচ্ছে। কেদারে খাবার পাওয়া যাবে না। কেদার প্রায় জনহীন। জল ছোঁয়া যাবে না। বিছানাপত্র সব কনকনে ঠাণ্ডা। বিশেষ করে ফেরা তো খুবই কষ্টকর হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি । আমরা তো বেশ দমে গেলাম। এমন সময় এক ভদ্রমহিলা আমাদের বললেন,  ” চলে যান মশাই। দেখবেন যাত্রাপথের কী অপরূপ সৌন্দর্য্য। কষ্ট হবে ঠিকই,  তবে ফিরে আসার পর দেখবেন  হিমালয়ের অপার সৌন্দর্য্য আপনাদের মনে থেকে যাবে। কিন্তু পরে আর শারীরিক কষ্টের কথা মনেই করতে পারবেন না।”   উৎসাহিত হয়ে কপাল ঠুকে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম। 

                             সত্যিই,  বিশেষ করে ফেরার সময় খুবই অসুবিধা ও কষ্ট হয়েছিল। হেঁটেই নেমেছিলাম আমরা। পাহাড়ে নামাটাই বিপজ্জনক। বরফে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছিল। পথে একটিও দোকান খোলা ছিল না। সকালে বেরিয়ে গৌরীকুণ্ডে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।  

                                তবে সত্যিই তুষারপাত সহ হিমালয়ের অপরূপ সৌন্দর্য্য স্মৃতিতে অমলিন রয়ে গেছে আজও, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও পরে আর কখনোই শারীরিক কষ্টের অনুভূতি মনে করতে পারিনি।  একে স্মৃতির এক সদর্থক মস্করা ছাড়া আর কিছু কি বলতে পারি ?

অহনা ভট্টাচার্য

একটা দেশের স্মৃতি

একটা দেশ স্মৃতি হয়ে গেল। প্রাক্-স্বাধীনতায় সূর্যের ওঠানামা দেখিনি, তবে যেন দেখতে পাই কোটি কোটি মানুষ একটা দেশের স্বপ্ন দেখছে। দেখছে সোনালি ক্ষেতের স্বপ্ন, আলোমাখা বিকেলের স্বপ্ন, বাড়ির দাওয়ায় নির্বিঘ্নে ঘুমের স্বপ্ন। পদ্মপাতায় জলের ফোঁটার মতো টলটল করছে সেসব স্বপ্ন।     

তারপর একদিন দেশ ভেঙেচুরে স্বাধীন হল। মানুষ মাথায় করে নিল সেই ভাঙাচোরা দেশ। তখন পৃথিবী সবে যুদ্ধ পরবর্তী ক্ষত মেরামত করছে। এই সময়ে আমাদের মোড়লরা ঠিক করলেন ভারতবর্ষকে বড়ো উন্নত দেশ বানাবেন। বেশ কিছু বছর ভালোরকম শিল্পগত প্রযুক্তিগত উন্নতি হল, শিক্ষাগত অগ্রগতি হল, স্বাস্থ্য-পরিষেবা বাড়ল, কৃষিবিপ্লব হল। এই অবধি যেন মনে হয়, তাহলে অসুবিধে কোথায়! সবই তো ভালো। ভালো এগোচ্ছিল ঠিকই, তবে সুপরিকল্পিতভাবে নয়। এইখানে একটা তথ্য দিই। বিংশ শতকের মাঝামঝি সময়ে, অর্থাৎ ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরপর ভারত ও চীনের সার্বিক দেশজ উৎপাদন (GDP) প্রায় এক। তফাতটা চোখে পড়ার মতো আসে ১৯৯৮ সালে, তারপর চীনের উন্নতি আর পিছন ফিরে তাকায়নি। মাও জেদং- এর নেতৃত্বে ১৯৪৫ সালে চীন অবলম্বন করে ‘জিলি জেনশেং’, অর্থাৎ বিদেশী পণ্য বর্জন করে দেশীয় উৎপাদনের দ্বারা স্বনির্ভরতা। যদিও এই প্রক্রিয়াটির পিছনে চীনের সাধারণ মানুষের বেদনাদায়ক ইতিহাস আছে কিন্তু তা একরকম রাষ্ট্রচিন্তার অপদার্থতা। যেটি বলার, সেটি হল আমাদেরও এমনই এক ছাঁচ একেবারে প্রস্তুত ছিল, কিন্তু মোড়লীয় দূরদর্শিতার অভাব ও স্বার্থকেন্দ্রিক কারণে এটি হয়ে উঠল না। গান্ধীজীর সমালোচনা আমরা অনেক বিষয়েই করে থাকি, কিন্তু তার অর্থনৈতিক চিন্তা, তার স্বরাজ ভাবনা ভারতবর্ষের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। স্বাধীনতার সময়েও ৮২-৮৫% জনসংখ্যা গ্রামীণ, আর সমস্ত শিল্প গড়ে উঠছে হয় বর্তমান শহরকে ঘিরে নয়ত নতুন শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা মাথায় রেখে। স্বাধীনতার ২০ বছরের মধ্যেই ভারত তাবড় তাবড় শিল্প প্রযুক্তিতে ভরে উঠল ঠিকই, কিন্তু মানুষের দুঃখ ঘুচল না। শহুরে প্রদীপ শিখার নীচে গ্রামকে গ্রাম পড়ে রইল অন্ধকারে। প্রয়োজন ছিল গ্রামীণ স্বনির্ভরতা, তার বদলে পেলাম গ্রামীণ দারিদ্রকে দূর থেকে দেখার শহুরে চোখ। আমরা গ্রামের মাঠ জলাভূমি এই সবকেই জায়গা দিলাম আমাদের কাব্যে, কিন্তু কৃষকের শ্রীবৃদ্ধিকে ভাবলাম অযথা অপ্রয়োজনীয়। নিকোনো দাওয়ায় শান্তি খুঁজলাম, কিন্তু তার ফাটা দেওয়াল ধ্বসে পড়া খড়ের চালের দায় নিলাম না। ফলে ভারতবর্ষ থমকে গেল, আর এগোল না। থমকে দাঁড়াতেই, যা ছিল তাও ক্ষইতে লাগল। সভ্যতার এই নিয়ম, চলমান থাকাই তার শর্ত। যা কিছু দাঁড়িয়ে পড়ে, তাতে ধুলো এসে জমে, তা সভ্যতা হোক, ভাষা হোক বা জলের ধারা। 

ধুলো জমাতে জমাতে একবিংশ শতকের ভারতবর্ষ অনেক খোল-নলচে পালটেছে, দেশটাকে আর চেনা যায়না। স্কুলজীবনে রচনা বইতে যে ভারতবর্ষকে পড়তাম তা বিংশ শতকের এক নবদিগন্তের স্মৃতি। তার সঙ্গে বর্তমানের কোন মিল নেই। 

একটা দেশ কেমন যেন স্মৃতি হয়ে গেল।  

ইলোরা ভট্টাচাৰ্য 

জন্ম-গাথা

বাড়ি থেকে প্রি-প্রাইমারি স্কুল আর প্রি-প্রাইমারি স্কুল থেকে বাড়ির দূরত্ব কখনোই এক থাকত না তার কাছে। কোনো এক অজানা জাদুবলে রোজই পাল্টে যেত কাঁচা রাস্তা, মানুষ ও গরুর বর্জ্য সম্পন্ন সরু গলি, বাঁশ-ঝোপ, এবাড়ি ওবাড়ির সীমানা ছুঁয়ে ছুঁয়ে আধা বৃত্তের পায়ে চলা পথ, ধুলা পড়া কুলতলি আর কালো পিচ ঢাকা টানা, চওড়া গা-চমকানো হাইওয়ে থেকে এক ঢালে নেমে যাওয়া স্কুল বাড়ির নিজের রাস্তা। এক দঙ্গল ছোটো, কিন্তু তার চেয়ে বড়ো বড়ো ছেলেমেয়েদের দলে টিনের বাক্স নিয়ে আর মায়ের বেঁধে দেওয়া মাথার দুপাশে দুটো ঝুঁটি দুলিয়ে দুরু দুরু বুকে সেও রওনা হত বাড়ি থেকে, আর কেন ইশকুলে যাচ্ছে এ কথা ভেবে ওঠার আগেই পৌঁছে যেত সেখানে। 

স্কুল বারান্দার মেঝেতে বসে কালো স্লেটে পাতলা চারকোনা লম্বাটে পেন্সিলের আঁকিবুকি কাটত আর মায়ের কথা মনে পড়ত যখন, অবোধ চোখ দুটো টলটলে জলে ভরে যেত। অথচ গাঢ় কালচে লাল বাদাম মটকা আর বুড়ির পাকাচুল বিক্রিবাটা হতে হতে যখন ইশকুল শেষের ঘন্টা বাজতো ঢং ঢং ঢং ঢং, পেন্সিল বক্সে রাখা পাঁচ পয়সা দেখে বাবার জন্য ভরপুর আনন্দে মন ভরে উঠত। একটা লাল টিকটিকি লজেন্স মুখে পুরে জিভ দিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে সোজা হাঁটু সমান ধুলো জমা সেই বড় বড় সবুজ কুলগাছতলায় নিমেষে পৌঁছে যেত। ব্যস! রাস্তা আর নড়ে না, চড়ে না, কোত্থাও যায় না! ঝুপসি গাছে ঝামোর ঝোমোর পাতার নাচ আর ঝরে পড়া কুলের গায়ে ধুলো, তার পায়ে ধুলো, ধুলো উঠে আসে রোদের মুঠিতে। বাকিরা সব কোনখানে, চেনা রাস্তার সন্ধিতে এগিয়ে গেল। সে দাঁড়িয়ে বাতাসের বাঁশি শোনে, বাঁশপাতার ধারালো ছড় টানা ভায়োলিন তার বুকের ভিতরে বেভুল বিষের বিছন ছড়ায়। পথ কি আর সমান থাকে? সেই তবে থেকেই পথের আকার প্রকার তার কাছে ভারি এক আশ্চর্যের ব্যাপার। যাবার সময় যা, ফেরার সময় তা নয়গো কোনোদিন। ভোরের শিশির মাখা কুসুম সূর্য আর গোধূলির ধুলো মাখা গোল টিপ সূর্য কি এক? তার মনে হয়, প্রতি ভোরে ঘুম ভেঙে রাস্তাগুলোও কাঁচা সবুজ শিশুর মতো কেবল হাঁটতে শেখে। আর সন্ধেবেলায় শতরঞ্চি গুটিয়ে দোল মঞ্চে প্রদীপ জ্বেলে ওরাও গুটিশুটি মেরে রাত্রির কোলে ঢলে পড়ে। সেও তো ভেবে রেখেছে ফিরতি পথে আয়তনে বেড়ে কাঁটা ঝোপগুলোর আঁচড়ে যত রক্ত ঝরেছে তার অনাবৃত হাতে, শুয়ে থাকা কররেখায়, সমস্ত একটা ঠান্ডা হলুদ চামড়ার ব্যাগে ভরে যে ঋতুক্ষরা নদীকে সে স্বপ্নে দেখে রোজ রাতে, তার বুকে ভাসিয়ে দেবে চুপিচুপি। তখন ভারি মজা! তখন কেবল নদীর দায়িত্ব ধুলো-কাঁটা-রক্ত মিলিয়ে মিশিয়ে পাথর জাগা স্রোতে বইয়ে দেওয়া। সে পাথরগুলোও তো পথেই ছিল। তারও আগে রুক্ষ-পুরুষ-পাহাড়ের খাঁজে খোঁজে, বুকের পেশীতে। অভিমান ভাঙার মতো তারাও ধীরে ধীরে ভেঙে গুঁড়িয়ে কখনো বালি কখনো জলের অতলে বাসা বেঁধেছে গোপনে। সেও যেমন সারাজীবনের গজিয়ে ওঠা গায়ে পায়ে শ্যাওলাগুলো ঘষে ডলে ছাড়িয়ে নেবে নদীর কিনারে ছয়কোনা পাথরের ওপরে বসে, জলে ধুয়ে নেবে ক্লেদ। সমস্ত পথই, সে জীবনেরই হোক, কিংবা স্মৃতির, আসলে জলেই ফিরে যায়।

ঈশিতা

বহু যুগের ওপার হতে…

স্মৃতিচর্চায়  মানুষের আধিপত্য আমার বক্তব্য নয়। আমি বলতে চাই সেই স্মৃতির কথা যা পাথুরে, বন্য। যার কথা বলে প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র, গাছপালা জীবজন্তুর ফসিলাইজড্ অবশেষ। মহাজাগতিক কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া ক্ষীণ ক্ষুদ্র সেসব স্বাক্ষর বয়ে বেড়াচ্ছে প্রকৃতি। এই স্মৃতি তাদের। অতিবৃদ্ধ ঠাকুমার ঝুলি  থেকে  আদ্যিকালের গল্প বলে তারা।

পৃথিবীর স্মৃতি বলে বৈজ্ঞানিক কোনো থিওরির কথা আমার জানা নেই। তবে দার্শনিক মতে অবশ্যই এর অস্তিত্ব আছে। প্রকৃতির মধ্যে নিহিত এক সমষ্টিগত শক্তি হিসেবে এর ব্যাখ্যা মেলে। বিজ্ঞান ও দর্শন এই দুই মিলেই  ইতিহাস তৈরি হয়। ইতিহাস একদিনে গড়ে ওঠে না। অনেক সময় লাগে এক একটি সামান্য ঘটনা বা ঘটনাক্রমের অসামান্য গাথা হয়ে উঠতে। এই সময়ের হিসেব না রাখতে পারলে সবটাই শুধু গল্পকথা হয়ে থাকত। তাই প্রামাণিক তথ্যের প্রয়োজনে বিজ্ঞান সবসময় ইতিহাসের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।   

বিবর্তনের শেষের দিকে আদিম  নিয়ান্ডারথালের ফসিল সমসাময়িক তথ্য জমা রেখে গেছে আধুনিক জীবজগতের DNA -র ভেতর। সভ্যতার ইতিহাসে লুপ্ত হয়ে যাওয়া পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের হাত ধরে মানবজাতি নিজের অতীতকে চিনেছে — এসব ক্ষেত্রে সত্যের অনুসন্ধান একটা সময় পর্যন্ত কিছুটা অনুমাননির্ভর ছিল। Relative dating, Stratigraphy, Fluorine dating জাতীয় উপায়ে তখন সময়কালনির্ণয় করা হত বটে কিন্তু অনেক সময়েই জালিয়াতি বা ভুল তথ্যর কারণে গবেষণা বিফল হয়েছে। চল্লিশের দশকের একটি আবিষ্কার এই গোটা প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দেয়।  

 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তরকালে গোটা দুনিয়া ভয়াবহ পারমাণবিক ধ্বংসের আতঙ্কে স্তব্ধ। সেই সময়ে মার্কিন বৈজ্ঞানিক Willard Libby খুঁজতে শুরু করেন পারমাণবিক বিকিরণের সৃজনাত্মক ব্যবহার। লক্ষণীয় বিষয় Willard Libby স্বয়ং সেই কুখ্যাত Manhattan Project –এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় কাজ করেছিলেন। হয়ত পারমাণবিক বিস্ফোরণের বিভীষিকাই তাঁকে নিয়ে গেছিল বিজ্ঞানের শান্ত রূপের খোঁজে। Libby আবিষ্কার করেন Carbon dating বা Radiocarbon dating পদ্ধতি যা বিপ্লব নিয়ে আসে আবিষ্কারকদের জগতে; প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, জীবাশ্মবিজ্ঞান আরও বহু গবেষণার ক্ষেত্রে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে।     

প্রত্যেকটি সজীব পদার্থ জীবনকালে সালোকসংশ্লেষ বা খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে ক্রমাগত শুষে নিতে থাকে কার্বনের একটি বিশেষ আইসোটোপ – কার্বন 14 (C¹⁴)। এই প্রক্রিয়া সজীবের মৃত্যুর সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায় এবং শুরু হয় শরীরের ভেতরে জমে থাকা কার্বন 14 এর অবক্ষয়। কার্বন 14 এর পরিমাণ প্রায় প্রতি 5730 বছরে অর্ধেক হয়ে যায়। ফলে কোনো জৈবিক দেহে অবশিষ্ট কার্বন 14 এর পরিমাণ বলে দিতে পারে  জীবের মৃত্যুর সময়। এভাবেই হিসেব করা যায় 50,000 থেকে 60,000 বছর পুরোনো যেকোনো জৈবিক অবশেষের বয়স। রীতিমতো অঙ্ক কষে বলে দেওয়া যায় ইতিহাসের সময়কাল। ফলাফল? অবশ্যই যুগান্তকারী। যে বিদ্যা একসময় শুধুই অনুমাননির্ভর ছিল তা হয়ে ওঠে বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক। আগামী প্রজন্মের জন্য  নথিবদ্ধ করা গেছে অতীতের কর্মকাণ্ডগুলো। 

 মানুষের চিরকালীন কৌতুহল প্রকৃতির রহস্যকে সমাধান করার চেষ্টা করে চলেছে।  অবশ্যই তার ভালো খারাপ দুই দিকই আছে কিন্তু  মৃত্যুর ‘পারে মৃত্যুঞ্জয় হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা তো আমাদের জিনের মধ্যে গাঁথা হয়ে গেছে। তাই এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর গতি নেই। শুধু স্মৃতিগুলোকে আর্কাইভে সামলে রাখি আগামী দিনের জন্য।   

জয়ীতা ব্যানার্জী

নিঝুমপুর

“তবু যেতে হবে শালবন,

“কেন না এ পথ

……..চলেছে নিঝুমপুর।”

পড়ছিলাম তারাপদ রায়-কে। ‘নিঝুমপুর’…৭৮ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত একটি আখ্যান। পাঠের প্রথমেই বাধা পাই সুধীর মৈত্র-র আঁকা নিঝুমপুরের ছবিটিতে। ছবিটির শিরোনাম এরকম হতে পারত,- “স্টিমার আসিছে ঘাটে পড়ে আসে বেলা…” আমাদের চির পরিচিত সহজপাঠের-ই প্রতিরূপ যেন।  

নাহ! এ কোনও পাঠ প্রতিক্রিয়া নয়। ভূমিকা মাত্র। এমনই সচ্ছল দুপুরে যখন নিঝুমপুরে বেলা পড়ে আসছে , সমান্তরালে আমার কন্যাসমা আমগাছটির কথা মনে পড়ছে! ওকে যখন ছেড়ে এসেছি, উচ্চতায় আমার সমান ছিল বোধহয়। ছিপছিপে চেহারায় মানানসই পাতার বাহার। হেজ-বেড়াটির গায়ে ওর অষ্টপ্রহর জেগে থাকাটি মনে পড়ছে। জানি না আজ কতখানি বিস্তারিত হয়েছে সে। কত বড়োই বা গৃহস্থ! সময় তো জানাবার অপেক্ষা রাখে না।

আরেকটু সন্ধ্যের দিকে প্রিয় চাঁপাগাছটির কথা ভাবি। যে বাড়িটির কথা বলছি তার সঙ্গে পরিচয় সম্ভবত আমার চতুর্থ শ্রেণী থেকে। সদ্য পাঠ্যবই-এ পড়েছি নরেনের দুঃসাহসিক গল্পখানি। চাঁপাগাছটির সম্পর্কে তাই বাড়তি কিছুটা সম্ভ্রম ছিল। বিশেষত সন্ধ্যের দিকে জানলার বাইরে তাকাতাম-ই না, যেখান থেকে তাকে দেখা যেত। “নরেন সাহসী ছেলে, আমি নই!”- একথা তো ব্রহ্মদৈত্য-ও জানেন। অথচ সেই ফুলের-ই ঘ্রাণ কেমন জীবনের সঙ্গী হয়ে রইল। কী অমোঘ, মায়াময়। গাছটি বুঝি আর নেই! আমার বেড়ে ওঠার সঙ্গী বাড়িটি-ও  আজ অন্য কারোর।

রাত ক্রমে ঘন হয়ে এলে তুলো তুলো ঝিমলি-কে ফিরে দেখবার সাধ হয়। যখন ওকে প্রথম কোলে নিই, হাতের তালুর দৈর্ঘ্যের ছিল। ছাই-সাদা রঙ, গোঁফ জোড়া বয়সের তুলনায় সামান্য ভারিক্কি। হাবভাব-ও তদ্রূপ। মাতা সহ তিন যমজ ভাই-বোনের গৃহত্যাগের পরেও সে স্থির করেছিল আমাদের বাড়িতেই থাকবে। আমাদের সোফাটিতেই ঘুমোবে আর আমাদের-ই উঠানে রোদ পোহাবে। তারপর মনে আছে তার অসুখের দিনগুলিতে বহুবার চেষ্টা করা হয়েছিল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাকে অন্যকোথাও ছেড়ে আসার। ফিরে আসত। একবার…দুবার…তিনবার…শেষবার সে নিজেই ছেড়ে গেল আমাদের। ফিরে আসেনি আর।

ঘোর রাতে এইসব স্মৃতিপ্রবণতা প্রাইমারি ইস্কুলের পলাশগাছটির কাছে নিয়ে যায়। বয়সের ভারে অনেকখানি ঝুঁকে পড়েছে সে। দেখি শেষ বিকেলের রোদে মাখা একটিও সাইকেল আর নেই সেখানে। অথচ লেবু পাকবার ঘ্রাণ আগের মতোটি আছে। অসহ, প্রবল…  

শেষরাতে আলো কমে আসে। নিরুদ্দিষ্ট অথচ আপাতসুখের ঘোরে আখ্যান শেষ হয়।  সোনালি আভায় আবছায়া কাকে যেন মা-বলে ডেকে বসি ভ্রমে…  

“অন্ধকারে কার গলা

যতদূর যেতে পারে তার থেকে

কিছু বেশি দূরে

নরম বালিতে মাথা রেখে

নীচে হাতের বালিশ

রেশম রেশম কেউ শুয়ে আছে।”

তিতলি সরকার

স্মৃতি বনাম বর্তমানের কাঁটাতার

ছোটোবেলায় ইতিহাস পড়তে গিয়ে খুব ভালো করে মুখস্ত করেছিলাম যে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব ছিলেন সিরাজউদ্দৌলা। শাসক, শাসন ও ধর্ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি তখনও মনে। সেকেন্ডারি স্কুলে উঠে প্রথম ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা পড়ি। বেশ ভালো লেগেছিল বিষয়টা। আমার সঙ্গে আলাদা ধর্মের মেয়েরাও পড়ত, আমার সব থেকে প্রিয় একজন বান্ধবী ছিল ভিন্ন ধর্মের। কখনও কোনো বিভেদের ভ্রুণাক্ষর-ও টের পাইনি। আমাদের কাছে ঈদের ছুটি, বড়োদিনের ছুটি আর দুর্গা পুজোর ছুটি একই ছিল। ছুটির কোনো ‘ধর্ম’ ছিল না তখন। তারপর ইতিহাস বদলায়, আসে বঙ্গ ভঙ্গ-এর কথা, ভারত-পাকিস্তান এই সব। বুঝতে পারি যে ধর্ম কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে পারে। প্রতিবেশীকে শত্রু বানাতে পারে। খবরের কাগজে টুকটাক খবর দেখতাম ধর্মের নামে মানুষ খুন হওয়ার। তখনও এই প্রশ্ন আসত যে মানুষ কাউকে খুন কেন করবে? তাও ধর্মের নামে? আচ্ছা ধর্মের নাম কেমন করে নেওয়া হয়? কিন্তু এগুলো তো অতীতে হত। এখন তো আমরা ধর্মনিরপেক্ষ। অথচ চোখে আঙুল দিয়ে সমাজ বুঝিয়ে দিল যে আমার একটি তাত্ত্বিক ধর্ম আছে এবং এর ঠিক বিপরীত মেরুতে বহু ধর্ম অবস্থিত। বুঝতে পারলাম যে আমার প্রিয় বান্ধবী আর আমি কতটা আলাদা। শিখলাম ‘ওদের’ আর ‘আমাদের’। ছুটিরও ‘ধর্ম’ যোগ হল। সমাজ আমাদের পার্থক্য করতে শেখায়, কিন্তু সেই পার্থক্যের কোনো যৌক্তিক উত্তর দেয় না।

রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় মানে সে রাজনৈতিক ব্যক্তি নয় — এটাই ধারণা ছিল আমার। নিজেকেও অ-রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবেই দেখতাম। কলেজে উঠে প্রথম একজন প্রফেসর বলেন, “The personal is political”। কেউ যেন জোর করে জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়। তখন হঠাৎ চারিদিকে দেখতে পাই যে আমরা কত ক্ষয়িষ্ণু একটা সমাজে বাস করছি। যেখানে মানুষ মারা যাচ্ছে কারণ তার অপরাধ হল যে সে মসজিদে যায়, মন্দিরে নয়। ধর্ম হল রাজনৈতিক। আজকাল খবরের কাগজ খুললে এমন খবর আমরা প্রায়শই পেয়ে থাকি। আমরা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শিখিনি তাই ভাবি না। আমরা একটি উদাস স্মৃতিযাপন করে বলি যে আমরা সর্বভাবে নিরপেক্ষ কারণ আমরা ‘স্বাধীন’। ব্রিটিশরা নিজেদের কার্যসিদ্ধি করতে ‘divide & rule’ শুরু করেছিল। আমরা নব্য-উপনিবেশবাদ করে তা চালু রেখেছি অন্য ভাবে। “তুই পাকিস্তানি”, “তুই দেশদ্রোহী” এগুলো এখন এতটাই সাধারণ যে যেকোনো পাড়ার চায়ের ঠেকে বসা ‘বুদ্ধিজীবি’ থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া সবাই সর্বদাই ব্যবহার করছে এবং বিচার করছে কে এই দেশে থাকার যোগ্য আর কে নয়।

আমরা যতই রাজনীতি থেকে দূরে থাকছি ভাবি না কেন, আমরা কীভাবে বাঁচব, কতটা সম্মানের সাথে বাঁচব সবটাই নির্ভর করে এক একটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা-র ওপর এবং বর্তমানে hot topic হল religion। একটু স্মৃতির ওপর জোর দিলে দেখতে পাওয়া যাবে ঠিক কয়েক দশক আগে মানুষ ধর্মের নামে কী কী করতে সক্ষম হয়েছিল। আজ আবারও ইতিহাসের সেই অধ্যায়ে ফিরে এসেছি যেন আমরা। এক পারমাণবিক বোমার ভঙ্গুর আস্তরণের ওপর আমার দাঁড়িয়ে আছি বর্তমানে, একটা ভুল পদক্ষেপ এবং সবই শেষ। কিন্তু এর মধ্যেও নিজের স্মৃতিতে যে ভারতের কথা কল্পনা করেছিলাম তার আশা ত্যাগ করিনি। আশা রাখি, ধর্মনিরপেক্ষতা স্রেফ বইয়ের পাতার একটি তাত্ত্বিক সংজ্ঞা হয়ে পড়ে থাকবে না, আমাদের নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো বাস্তব হয়ে দাঁড়াবে

তুষার ভট্টাচার্য

কিছু সংলাপঃ নিজের কানে শোনা

কাঠের টেবিল, বেঞ্চি।

ব্রিকোয়েটের উনুনে কেটলি।

বেঞ্চে বসে আছে দু-জন। হাতে কাঁচের গ্লাসে চা। 

বেঞ্চির ওপর ‘বর্তমান’ কাগজ। আর একটা মোবাইল। মোবাইলে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে।

– অমলেট হবে? জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

– না দাদা, আজ বাবার বার। আজ আর আঁশ ছোঁব না। দোকানির উত্তর। 

– তাহলে চা দিন আর নোনতা বিস্কুট দিন।

– বসুন।

বসলাম।

মোবাইলে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে বেশ আশ্চর্যই হলাম। ভাবলাম, এ নিশ্চয়ই বাইশে শ্রাবণের সাইড এফেক্ট। 

যার মোবাইল, সে গান শুনতে শুনতে বেশ মাথা দোলাচ্ছিল।

তারপর যা শুনলাম, চা খেতে গিয়ে বিষম লাগে আর কী… 

গান শোনা ওই ভদ্রলোক সঙ্গীকে বলে উঠলেন, এই রোবীন্দনাথ কত কবিতা আর গান লিখেছে জানিস? অন্তত কয়েক কোটি। 

– আমার কিন্তু হেভি ভালো লাগে রোবীন্দসঙ্গীত শুনতে। আর ওই কবিতাটা বল — কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি? কত ভেবে লিখেছে বল?

-তবে সব কবিতা কিন্তু রোবীন্দনাথ নিজে লেখেনি।

-রোবীন্দনাথের কোনো ডিগ্রি নেই। কিন্তু অনেক পয়সা ছিল। সেই পয়সা দিয়ে উনি তিন হাজার লেবার রেখেছিলেন। তারা সবাই বসে বসে কবিতা লিখত। 

-ওই সময়ে অনেক ‘ট্যালেন্ট-ট্যালেন্ট’ লোক ছিল। দেখিসনি, একটাই মাস্টার ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক সব পড়াত। এখন এক একটার জন্যে এক একটা মাস্টার। আমিই তো প্রাইমারিতে একটা মাস্টারের কাছেই পড়েছি। এখন সবের জন্যে একটা করে মাস্টার। 

-ওরকম ট্যালেন্টওলা লোক, ধর একটা কবিতা লিখল। তারপর সেটা রোবীন্দনাথকে দেখাল। উনি বললেন, এটা রেখে দাও, আমি পরে দেখব। তারপর তো সে ভুলে গেল।

-সেই কবিতাগুলোই রোবীন্দনাথ নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে। নাহলে একজনের পক্ষে সম্ভবই নয়, এত কবিতা লেখা। আরে লোকটাকে তো খেতে হবে, শুতে হবে। এত কবিতা লেখার সময় কোথায়?

কী করব? চা খেয়ে চলে যাব? না কি আরও শুনব উনি আর কী বলেন? উঠতে পারলাম না। আরও একটা বিস্কুট চাইলাম। 

– একমাত্র ‘গীতাঞ্জলি’টাই উনি নিজে লিখেছেন, বুঝলি? কারণ ওরা সব পরীক্ষা করে দেখে নিয়েছে, রোবীন্দনাথ কবে, কীভাবে এসব লিখেছে। সব প্রমাণ দিতে হয়েছে। ওরা সব প্রমাণ দেখে তবে নোবেল দিয়েছে। ওইরকমই অমত্ত সেনকেও সব প্রমাণ দিতে হয়েছে। তবে নোবেল পেয়েছে।

– এখনও অনেক কবিতা আছে রোবীন্দনাথের। সেসব এখনও ছাপা হয়নি। আস্তে আস্তে সব বেরোচ্ছে। 

– আরে, যে লোকটা ইস্কুল যায়নি, সে এত লিখবে কী করে? ধর, রোজ যদি বারোটা করে কবিতা লেখে, তাহলে এত কোটি কবিতা লিখতে কত সময় লাগে? বলুন?

এই ‘বলুন’টা আমাকে। আমি আর কী বলব! ভাবছি, পাঁচ নয়, দশ নয় একেবারে বারোটা করে কবিতা? বারো সংখ্যাটা এঁর মাথায় এল কী করে!

– তবে আমি রোবীন্দনাথকে খুব শোদ্ধা করি, জানেন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত লিখেছে, বাংলাদেশের লিখেছে। আর একটা দেশেরও লিখতে বলেছিল, উনি লেকেন নি।

– সারা পিথিবীতে উনি একজন টপ লোক।

নূপুর বন্দ্যোপাধ্যায়

মাতলা

মাতলা নদীকে সেই প্রথমবার দেখা। শুধু দেখা তো নয়, তার পাগলামির, খামখেয়ালির গল্প শোনা পুরোনো যাত্রীদের কাছ থেকে। বেশিরভাগই সরকারি স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা। মাতলার বুকের উপর দিয়ে যাদের নিত্যকার যাতায়াত নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বহু বছর ধরে। না, বুকের উপর দিয়ে মানে আমরা যেমন বুঝি নৌকোয় বা সেতুর উপর দিয়ে, তা কিন্তু নয়। বরং হেঁটে, মাতলার গোড়ালি বা হাঁটুজলের উপর দিয়ে। নৌকো কেবল যখন ভরা বর্ষা, তখনকার জন্য। বাকি সময় কাদাজল পেরিয়ে হাঁটু অবধি কাপড় তুলেই যাতায়াত। সেই অবস্থাতেই স্কুল অফিস সেরে আবার কলকাতাগামী ট্রেনে চেপে বাড়ি; মাতলার কাদার গুঁড়ো পায়ে মেখে, মাতলাকে বুকে চেপে। এরই মধ্যে কোনো কোনোদিন ঘটে যায় ভয়ংকর সব দুর্ঘটনা। পায়ে হেঁটে নদী পেরোনোর সময় হঠাৎই মাতলার জল বেড়ে যায় নাটকীয়ভাবে। গোড়ালি বা হাঁটুজল হঠাৎ উঠে আসে গলা পর্যন্ত, উঠতে চায় মাথার উপর। নিজের খেয়ালে পাগল টানে নদী তখন আকন্ঠ গ্রাস করে নিতে চায় রোজ যারা পেরিয়ে চলে তাদের। মাঝিরা টের পেয়ে কোনোরকমে তুলে নেয় নৌকায়। সেই অবস্থাতেই তারা স্কুল যায়। আবার ফিরে আসে, প্রতিদিন। সেই মাতলা…

আমি যখন তাকে দেখি, মাতলার বুকের উপর তখন শিকলি। বিশাল সেতুর উপরে মোটর গাড়ি চেপে রোজ পেরোই তাকে। আর মনে করি তাকে নিয়ে শোনা ভয়ংকর সব গল্প। নিজেকে সেই জায়গায় কল্পনা করে বারবার শিহরিত হই। আর আশ্বস্ত হই, অন্তত ওই সময় ওই অবস্থায় আসতে হয়নি চাকরি করতে। তবু নদীটাকে দেখে কখনও মনে হয় না এমন ভয়ানকও হতে পারে তার রূপ। ক্যানিং স্টেশন নেমে তখন আমার চোখে এক অন্য জগত। চাকরির শৃঙ্খলাবদ্ধ বাধ্যবাধকতায়, রোজকার যাতায়াতের গ্লানি সেই জগতকে দেখার, চেনার প্রভূত সুযোগ করে দিলেও তাকে উপভোগ করার সুযোগ দেয়নি। তবুও নদী কেমন অজান্তেই জড়িয়ে নেয়, জীবন কেমন না জেনেই জুড়ে যায় জীবনের সাথে, সেটা বোঝা যায় অনেক পরে, দূরত্বে। 

প্রথম দর্শনেই মাথা ঘোরায় মাতলার বিশালতা। যেন চোখে ধরে না, এমন তার বিপুল দেহ। গ্রীষ্মে জল যখন অনেক কম, তার পারে ঘাটে তখন প্রচুর কাদা। মাঝে মাঝে দরকার পড়ত বাসন্তীর এপার থেকে ওপারের ঘাটে যাওয়ার, ছেলেমেয়েদের ব্যাংকের একাউন্ট যাতে তারা স্কুলে বসেই খুলতে পারে, তাই ব্যাংকে যোগাযোগ করার জন্য, আরও কিছু কাজে। মানুষ, গবাদি পশু আর সাইকেল মোটর সাইকেল বোঝাই ভটভটি নৌকো যেই মাঝ নদীতে, জলের গভীরতা বোঝা যেত তখন। নৌকো একবার এদিকে একবার ওদিক হয়, কাঁপে। তার মধ্যে আমি ভয় পাচ্ছি বুঝে স্থানীয় মানুষের কি আহ্লাদ! ওমা! তারা যে রোজ যায় এইভাবেই, “মেডাম” তবে ভয় পায় কেন এত! “মেডাম” তখন দেখছে বহুদূরের ওপার প্রায় কাছে এসে পড়েছে। ঘাটের সিঁড়ি যে সম্পূর্ণ হেলে পড়েছে একদিকে! বসে গেছে কাদায়। এমনই নাকি অবস্থা তার দীর্ঘদিন ধরে। অমনিভাবেই রোজ পিছল সেই সিঁড়ি চড়ে মানুষ, পশু, সাইকেল, মোটর সাইকেল। সেখানেও আর এক দফা টিপ্পনি, “মেডাম” শহরের মানুষ হে হে, ওটা তো ওর’মই পড়ে আছে অনেককাল, এইভাবেই যেতে হয়। 

আজ বহুদূরে দাঁড়িয়ে স্মৃতি আবছা, হালকা সব ছবি। তবু, পিঠে ঝোলা নিয়ে মাঝ মাতলায় নৌকোয় ভেসে চলে বহিরাগত এক মেয়ে।

ফারহানা হালদার

শিক্ষার আলোতে ধর্ম

হঠাৎ যেন মনে হল এই সমাজের ভবিষ্যতের কথা, মানুষ নিজের নিজের সত্তার কথা ভুলতে বসেছে। নিজেদের আসল ধর্ম কী হওয়া উচিত এবং কোন ধর্মের মানুষ তাদের জন্য মঙ্গলময় এই বিষয় নিয়ে মেতে আছে গোটা ভারতবর্ষের অধিকাংশ মনুষ্যজাতি । এই সবের মাঝে তারা ভুলতে বসেছে তারা যে আসলে মানুষ। সবাই যেন কোনো এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলেছে ।

                 সম্প্রতি ভারত তথা সারা বিশ্বের অবস্থা বোধহয় খুবই শোচনীয়, এই সমাজ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মেতে আছে, তার মধ্যে একটি হল ধর্ম । ধর্ম কী? এটা না জেনেই ধর্ম নিয়ে লড়াই করে এবং নির্দ্বিধায় কিছু প্রাণকে নিষ্প্রাণ করে দেয় । 

                  ধর্ম কী, এটা জানার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল শিক্ষা। সম্প্রতি এই গোলযোগের আসল কারণ বোধহয় বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা । এইসবের মাঝে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার কাঠামো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু নামেই প্রতিষ্ঠানগুলি আছে কিন্তু তাদের আসল ধর্ম, শিক্ষা প্রদান করা সেটা এখন স্বল্প পরিমাণে বিদ্যমান। এই সময়ে আমাদের দরকার স্বামী বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ,কাজী নজরুল ইসলাম, এপিজে আব্দুল কালাম – এঁদের মতো শিক্ষক। একমাত্র শিক্ষাই পারে এই সমাজকে পরিবর্তন করতে। ভারতবর্ষে শিক্ষা বিস্তারের জন্য যাঁরা লড়াই করে গেছেন তাঁরা যদি দেখতে পেতেন সেই শিক্ষাব্যবস্থার হাল কতটা করুণ তাহলে বোধহয় তাঁরা ভাবতে বসতেন এটা কোন ভারতবর্ষ ?

                     যেখানে আমাদের ভারতবর্ষ ধর্মের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ সেখানে সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে রয়েছে এই ধর্ম। ধর্মের নামে নির্দ্বিধায় কিছু প্রাণ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। যতবার ধর্মে ধর্মে লড়াই হয়েছে  ততবার ধর্মের বোধহয় কিছুই হয়নি হয়েছে মানুষের। 

 আসলে যারা এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তারাই ধর্ম সম্পর্কে বোধহয় জ্ঞান রাখে না, তাই এত সমস্যা। কোনো ধর্ম মানুষ মারার পক্ষপাতি নয়, কোনো ধর্ম বলেনা হিংসা করো। সমস্ত ধর্ম মানুষকে সুন্দর জীবন অতিবাহিত করার শিক্ষা দেয়, নিয়মশৃঙ্খলা শেখায়, মানুষের পাশে থাকতে শেখায়। তাই যারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে তাদের অবশ্যই ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা নেওয়া উচিত, সঠিক জ্ঞান অর্জন করা উচিত। তাহলে হয়ত ভারতবর্ষে ধর্ম নামের গোঁড়ামি আর থাকবে না ।   

             শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা নয় সমাজ আমাদের নানান ধরনের শিক্ষা দেয় যেগুলো আমাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা মানুষকে কেবল মানুষ হিসেবে গণ্য করতে শেখায়। মানুষ যা ধারণ করে তাই ধর্ম। মনের ভেতর পালিত হোক ধর্ম; আমরা যেন নিজেদের মতো স্বাধীনভাবে স্ব-ইচ্ছায় ধর্ম পালন করতে পারি। কেউ কারোর ধর্ম কারোর ওপর চাপিয়ে না দিই। সমস্ত ধর্মের ভেদাভেদ ভেঙে একদিন ভারতবর্ষ এই শিক্ষার আলোতে সুসজ্জিত হোক। আমরা যেন নির্দ্বিধায়  বলতে পারি —  আমার প্রাণের ভারতবর্ষ তোমার মাঝে হিন্দু মুসলমান শিখ খ্রিস্টান জৈন বৌদ্ধ হাতে হাত রেখে নিঃসংকোচে চলতে পারে। আমি গর্বিত। তোমার মাটিতে জনম আমার যেন তোমাতেই হই শেষ।

বিভাস সাহা

স্মৃতি ও বিস্মৃতি

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মারকুয়েজের ‘একশ বছরের নির্জনতা’  উপন্যাসে ম্যাকোন্ডো গ্রামে মানুষ অকস্মাৎ অনিদ্রা রোগে আক্রান্ত হয়। গ্রামের আদিপুরুষ এবং বুয়েন্দিয়া পরিবারের প্রধান হোসে আর্কাদিয়া বুয়েন্দিয়া তখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে; সে ভাবে, অনিদ্রা চলতে থাকলে সকলের স্মৃতি নষ্ট হয়ে যাবে। তখন মানুষ ভুলে যাবে শুয়োর কাকে বলে, ছাগলের কাজ কী, কীভাবে আগুন জ্বালাতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই সে গরুর গায়ে লিখে রাখে ‘গরু’, ‘গরু দুধ দেয়’, লোহার গায়ে লিখে রাখে লোহা, বিষফলের গাছে লিখে রাখে ‘এই গাছের ফল খেয়ো না’  – এইরকম সব।

স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্কে হাজার হাজার নিউরাল নার্ভের তন্তুজালে সুরক্ষিত তথ্য। এই তথ্য সময়ের সঙ্গে সংগৃহীত হয়, এবং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের এই ক্ষমতা বাড়তে থাকে, আবার একটা বয়সের পর বৃদ্ধ অবস্থায় এই ক্ষমতা নিঃশেষিত হয়ে যায়। তার উপর মস্তিষ্কের অসুস্থতা হলে, যেমন পারকিন্সনস্ বা ডিমেন্শিয়া হলে, স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়, শরীরের বাকি অঙ্গের উপর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা চলে যায়। মস্তিষ্কের ক্ষমতা যেহেতু সীমাবদ্ধ তাই অব্যবহৃত স্মৃতি মস্তিষ্ক মুছে ফেলে নতুন স্মৃতির জায়গা করে দেয়। 

সালভাদোর দালির বিখ্যাত ছবি ‘পারসিস্টেন্স্ অফ মেমোরি’ চারটি ঘড়ির ছবি। চারটির মধ্যে তিনটি ঘড়ি গলে বিকৃত হয়ে গেছে। চতুর্থ ঘড়িটি গলেনি বা বিকৃত হয়নি, কিন্তু তার উপর পিঁপড়ে জড়ো হয়েছে যেন সেটা একটা মৃত প্রাণী। এই ঘড়িগুলি রাখা আছে একটি নির্জন সমুদ্রতীরে। কথিত আছে, রোদে গলে যাওয়া চিজ় দেখার এক স্মৃতি তাঁকে এই ছবিটি আঁকতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এই ছবিতে স্মৃতি যে সময়ের এক অনিবার্য প্রতিচ্ছবি এবং সেই প্রতিচ্ছবি নিজের ইচ্ছামতো রূপ ও আকার বদলে নেয়, সেই কথা যেন দালি বলতে চেয়েছেন।

স্মৃতি যে সবসময় নিজস্ব অভিজ্ঞতার নির্যাস হবে তাই নয়, শোনা গল্প থেকেও আমরা একটা জায়গা বা কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে পরিষ্কার একটা ধারণা করি, এবং ক্রমশ তা আমাদের কল্পনার জোরে স্মৃতির মতো হয়ে ওঠে। এমনকী একসময় আমরা ভুলে যাই সেই জায়গায় সত্যি সত্যিই কখনো যাইনি, স্রেফ কল্পনা করেছি। কল্পনাশক্তির ক্ষমতা এইভাবে অনেকসময় ‘স্মৃতি’ নির্মাণ করে। রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকে অমল দইওয়ালাকে তার গ্রামের কথা হুবহু বলে দেয়, সেই গ্রামে অমল কখনো যায়নি, তার কোনো বর্ণনা কারও কাছে শোনেওনি, তবু সে যেভাবে সেই গ্রামের বিবরণ দেয় তাতে দইওয়ালা অবাক হয়ে যায়। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এ আমরা আর এক ধাপ এগিয়ে যাই। সেখানে মাশুল কালেক্টর প্রথমে অশরীরীদের দেখতে পায়, এবং তারপর তাদের অংশ হয়ে ওঠে। সে যে শুধু এক সুদূর অতীতের স্মৃতি নির্মাণ করে তাই নয়, সেই স্মৃতি ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ লাভ করে এবং মনে হয় সে যেন রাত হলেই জাতিস্মর হয়ে ওঠে। এইভাবে সে দুই পৃথিবীর মধ্যে যাতায়াত করে,  এমনকী জীবিত মানুষ মেহের আলির “তফাত যাও” হাঁক দেওয়া যেন মনে করিয়ে দেয় ওই মেহের আলির সঙ্গে আজকের মাশুল কালেক্টর সত্যিই এক সুদূর অতীতের বাস্তবতার অংশ ছিল।

স্মৃতি ও বিস্মৃতি নিয়ে আমরা বেঁচে থাকি। আমাদের কিছু প্রিয় স্মৃতি থাকে, তার কাছে মাঝে মাঝে ফিরে যাই, আনন্দ পাই। স্মৃতি তো অনন্ত সময় প্রবাহের একটা মুহূর্ত মাত্র, আমরা সেই মুহূর্তটুকু সযত্নে ধরে রাখি, তাকে ইচ্ছামত সাজাই, অনুভূতি দিয়ে জারিত করি। তারপর একদিন বিস্মৃতির ধুলো জমে, অনুভূতির তীব্রতা হারিয়ে যায়। সেই অতীত মুহূর্তটির একদিন মৃত্যু হয়ে যায়। 

মনোজবা ব্যানার্জী

স্মৃতি ও মনস্তত্ত্ব: বিজ্ঞানের আলোয় অনুভূতির ছায়া

মানুষ তার স্মৃতির সমষ্টি। আমরা আজ যা, তা মূলত গতকালের অভিজ্ঞতারই সংগৃহীত প্রতিচ্ছবি। মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে স্মৃতি কেবল অতীতের তথ্য সংরক্ষণ নয়; এটি আমাদের পরিচয়, সিদ্ধান্ত, আবেগ ও আচরণের মূল ভিত্তি।

বৈজ্ঞানিকভাবে স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়াকে তিনটি ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়—সংকেতায়ন (encoding), সংরক্ষণ (storage) এবং পুনরুদ্ধার (retrieval)। মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশটি নতুন তথ্যকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার অ্যামিগডালা আবেগের সঙ্গে যুক্ত স্মৃতিকে অধিক তীব্র ও স্থায়ী করে তোলে। তাই কোনো আনন্দময় মুহূর্ত বা গভীর বেদনার ঘটনা আমাদের মনে দীর্ঘদিন অম্লান থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, এর কারণ হলো অভিজ্ঞতার সময় জৈবিক উত্তেজনা (biological arousal) বেড়ে যাওয়া, যা সেই স্মৃতির স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করে।

মনোবিজ্ঞানে “৭ সেকেন্ড ম্যাজিক নাম্বার” বলে যে ধারণাটি প্রচলিত, তা মূলত স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি (short-term memory) ও মনোযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

১৯৫৬ সালে মনোবিজ্ঞানী George A. Miller তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্র The Magical Number Seven, Plus or Minus Two-তে দেখান যে, মানুষ একসঙ্গে গড়ে প্রায় ৭±২টি তথ্য (যেমন সংখ্যা বা শব্দ) স্বল্পমেয়াদে ধরে রাখতে পারে। সময়ের হিসাবে দেখা যায়, কোনো তথ্য যদি আমরা প্রায় ৭–১০ সেকেন্ডের মধ্যে পুনরাবৃত্তি না করি, তবে তা মস্তিষ্কের স্বল্পমেয়াদি ভাণ্ডার থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে।

সাহিত্যের দৃষ্টিতে স্মৃতি এক নীরব নদী, স্মৃতি আমাদের মানসপটে আলো-ছায়ার খেলা। কখনো তা আশ্রয়, কখনো তা ভার। মনস্তত্ত্ব বলে, সুস্থ মানসিক জীবনের জন্য স্মৃতিকে দমন নয়, বরং বোঝা জরুরি। স্মৃতিকে প্রসেস করা মানে সেই ঘটনার আবেগ, অর্থ ও প্রভাবকে সচেতনভাবে অনুধাবন করা। অতীতকে গ্রহণ করা মানে তাকে সমর্থন করা নয়; বরং স্বীকার করা যে সেটি জীবনের অংশ। Acceptance আমাদের শেখায়, ঘটনাটি হয়ত পরিবর্তন করা যাবে না, কিন্তু তার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সম্ভব। মনোচিকিৎসায় (therapy) প্রায়ই দেখা যায়, যখন ব্যক্তি তার অতীত অভিজ্ঞতাকে ভাষা দিতে পারে, তখনই তার মানসিক ভার অনেকটা লাঘব হয়। কারণ ভাষায় প্রকাশ মানেই আবেগকে কাঠামো দেওয়া, আর কাঠামো মানেই নিয়ন্ত্রণের সূচনা।

“Memory is the diary that we all carry about with us.” – Oscar Wilde। এই অদৃশ্য ডায়েরির পাতায় লেখা থাকে আমাদের হাসি, বেদনা অথবা জীবনের পাঠ, সময়ের কালি শুকিয়ে গেলেও অনুভূতি মুছে যায় না। তবে স্মৃতির পাতায় আটকে থাকা নয়, বরং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই সামনে এগিয়ে চলাই জীবনের প্রকৃত প্রজ্ঞা।

মহুয়া ভৌমিক

স্মৃতির পাঠ

“Memory is a strange Bell—Jubilee, and Knell.” সদ্য মাতৃহারা এমিলি ডিকিনসনের চিঠিপত্র থেকে প্রাপ্ত স্মৃতি সম্বন্ধীয় এই দ্বৈত চেতনা প্রথম পাঠেই আমার কাছে লিঙ্গচর্চার বোধজগতকে বন্দি করেছিল। প্রখর ভাবে। ডিকিনসন বলছেন স্মৃতিমন্থনে উঠে আসা অতীত মুহূর্ত ধ্বনিত হয় আজব দুই উদযাপনের পরিমাপকে – আনন্দ ও শোক। যে ‘স্মৃতি’ শব্দের সংস্থাপনে ‘মেদুরতা’ শব্দটির ব্যবহারই বহুল প্রচলিত, অতীতের প্রতি নিম-মধুর আকাঙ্ক্ষাসহ ফিরে চাওয়া বোঝাতে, সেখানে মর্মযন্ত্রণার ছোঁয়া কোন পথ দিয়ে এল তাহলে? এর এক কথায় উত্তর হল – মৃত্যু।   

ডিকিনসনের বক্তব্যের সাথে আমার বোধের সম্বন্ধস্থাপন হয় যখন দেখি কত শত যৌন নিগৃহীতা আর গৃহ হিংসার ভিক্টিম গৌরবান্বিত রক্ষণশীলতা আত্মস্থ করা ও সনাক্ত করার দোলাচলে পড়ে ঠোক্কর খায় উদ্ভটভাবে পরস্পরবিরোধী এক অনুভূতিকেন্দ্রে। কখনো আত্মীয় কাকা, জ্যাঠা, দাদা বা ভাই, কখনো অনাত্মীয় পুরুষ, আবার কখনো ভালোবাসার মানুষটিকে ঘিরে থাকে এহেন মিশ্র অতীতচারণ। নোনা পুঞ্জীভূত মর্মযন্ত্রণা সশব্দে হত্যা করে শৈশবের নিষ্পাপ সারল্য, কৈশোরের স্বচ্ছন্দ উদযাপন, যুবাবস্থার স্বপ্নিল যাপন, বা মধ্যবয়সের খানিক প্রাপ্তিসুখের আমেজ। এখানে একটা অনুকাহিনী শোনাই। বছর চোদ্দোর কিশোরীর ঝকঝকে এক স্কুল-ছুটির সকাল। সদ্য পিতৃহারা সে। তার মাকে সংসারের দায়িত্ব সামলে বেরোতে হল মাসকাবারি বাজার করতে। তার দিদি টিউশন পড়াতে বেরিয়ে গেছে আরও সকালে। সেদিন আসার কথা ছিল পাশের পাড়ার ইলেকট্রিশিয়ান কাকুর। সেই কিশোরীর ওপর ভার পড়ল কাজের তদারকির নামে কাকুকে এক কাপ চা করে দিয়ে স্কুলের হোমওয়ার্ক সেরে ফেলার। বটবৃক্ষের ছায়াসম বাবা চলে যাওয়ার পর যখন মা আর দিদি সংসারের ভার বহন করছে কিশোরী একটা দায়িত্ব পেয়ে যাওয়ায় বেজায় খুশি। উপযোগী হতে পারাটা তার কাছে গর্বের, ‘বড়ো’ হওয়ার লক্ষণ। বিপত্তি ঘটল কাকু যখন রান্নাঘর অবধি পৌঁছে মেয়েটির গায়ে হাত বোলাতে শুরু করল। অস্বস্তির আঁচ বাড়তে থাকায় মেয়েটি কোনোমতে চা-এর কাপ ধরিয়ে বই খাতা নিয়ে পড়তে বসে গেল। কিন্তু লোলুপ দ্বিপদটি পিছু নিল মেয়েটির। এরপর মেয়েটি এক ঘর থেকে অন্য ঘরে হাঁটাচলা করতে লাগল। লুকোনোর জায়গা নেই। আর লোকটি তো ছাড়েনি নিজের ভদ্রমানুষের মুখোশ। সে তো সমানে মেয়েটিকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করে চলেছে। লোকটির হাত সমানে দুমড়ে মুচড়ে দিতে থাকল তার নবীন স্বপনচারী মন। অতঃপর অসহায় মেয়েটি খোলা বারান্দায় মায়ের পথ চেয়ে অপেক্ষা করতে থাকে আর সকল সাহস সঞ্চয় করে অস্ফুটে বলে ওঠে “মাকে বলে দেব”। কিন্তু সে তো শুধু আদরই করেছে। হঠাৎ সেই বারান্দাতেই বসে পড়ে ফ্রক পরিহিত পা এর ভিতর হাত চালিয়ে দেয় সে। পৃথিবী দুলে ওঠার আগেই রিকশার শব্দ, মা এসে গেছে। না, মেয়েটি সেখানে দাঁড়িয়ে লোকটির সামনে মাকে কিছু বলতে পারেনি। ঘেন্না হচ্ছিল তার শরীরে লেপ্টে থাকা লোকটির স্পর্শকে। লোকটি চলে যাওয়ার পর শুধু বলতে পেরেছিল, “কেন আমাকে একা রেখে গিয়েছিলে?” নিজের মনোগত নিষ্পাপ কোমলতার বলি দিয়ে ‘বড়ো’ হতে সে চায়নি। তবে আশ্চর্যভাবে চোদ্দোর এই আমির স্মৃতিরোমন্থনে ঘৃণা বা ক্রোধের সাথেসাথে সেই মেয়েলি সহজতার আবেশও ভীষণভাবে জড়িয়ে থাকে। 

নানা অনুভূতির দোদুল্যমানতা জীবনের অংশ। তবে কোনও নির্যাতিতার স্বাভাবিকতার মৃত্যুর ভারে স্মৃতির ওপর সৃষ্টি হওয়া চাপ ভিন্ন। তা যেমন লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক সমতার প্রতি আঘাত, তেমনই মেয়েটির ব্যক্তিত্বের বিকাশের ওপরও। আবার এও দেখা যায় যে উৎপীড়িতার স্মৃতিপুটের আবিল জলে যতই প্রান্তিক হয়ে যাক সাবলীল হর্ষের রঙিন ছটা, তা কখনো কখনো হয়ে ওঠে উত্তরণের জন্মবীজ। নিজের কাছে নিজের ইতিবাচক ভাবমূর্তি স্থাপনের দিকে নিয়ে যায়, প্রতিদিন, একটু একটু করে। সকল নির্যাতিতার প্রতিক্রিয়া এক হয় না মানি। তবু সহ উৎপীড়িতার প্রতি আর্জি স্মৃতির ঘণ্টাধ্বনি যখন বাজতে থাকে হর্ষ আর বেদনার দড়ির টানে, অন্ধকার থেকে বেরিয়ে জ্যোতি হয়ে ওঠার নামই পথচলা। 

রোশনি গুহ

“স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা”

এক অবিভক্ত দেশ, কত মানুষের যাপনের কথা। কত লড়াই, কত হার, কত জিতের গল্প। আবার রয়েছে কত মানুষের শিকড় ছেঁড়ার যন্ত্রণা। এত এত হারানোর মধ্যে, যা রইল মনের গহীন কোণে, তাই তো আসলেই স্মৃতি। কিন্তু তার পরেও রয়ে গেল বাঁচার প্রবল ইচ্ছা, শুরু হল জেগে থাকার লড়াই, জাগানোর লড়াই। জেগে থাকা থেকে জাগানোর চলার পথটাকে প্রশস্ত করল সেই ফেলে আসা ‘স্মৃতি’। 

এত কিছু বলতে পারলাম, তার নেপথ্যে রয়েছেন আমার ঠাকুমা, আমাদের মন্দিনি। মন্দিনি যতদিন ছিলেন আমার রোজ রাতের রুটিন ছিল মন্দিনির কাছে গল্প শুনে রাতে ঘুমাতে যাওয়া। ‘দাদুর দস্তানা’ থেকে ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’, এই সব গল্প-ই মন্দিনির থেকে শোনা। আর এর মাঝেই ছিল মন্দিনির ছোটোবেলায় দেশ ছাড়ার গল্প। কী অদ্ভুতভাবে উনি ঘরটার বর্ণনা দিতেন, মনে হত জীবন্ত ছবি। আর বাড়ির সামনের আমগাছটার কথা আমার মনে হয় কেবল গল্প শুনেই এখনও আমি দেখতে পাই। তারপরের গল্পটা ছিল কাঁটাতারের এপারের কথা। নিজের জায়গা তৈরি করে নেবার জন্য আবার নতুন করে সংগ্রামেরর পথ বেছে নেওয়া। তবে আজ মন্দিনি নেই, তার দুই ‘দেশ’, আছে কি? নাকি রইল পরে ‘দ্বেষ’ টুকুই? একরৈখিক ভাবে এসবের বিচার করা যায়না। তবে ইতিহাস বলে, ‘দ্বেষ’ ও ‘দেশ’-এর সংঘর্ষে দেশ জিতে গেছে বরাবর। আর জিতে যাওয়ার পথে পরম বন্ধু কিন্তু হয়েছে ওই ‘স্মৃতি’। 

ওরা দেশ ছেড়েছে। আর আমরা রোজ বড়ো হচ্ছি আর ফেলে আসছি জীবনের একটা একটা স্তর। কেউ শৈশব, কেউ কৈশোর, কেউ যৌবন। এর সাথে চলে যাচ্ছে কত মানুষ আর কত মুহূর্ত। ওই স্মৃতির যে খাতাটা খোলা হয়েছিল, রোজ রোজ একটা করে পাতা জুড়ে যাচ্ছে তার সাথে। আবার, ওই খাতার কয়েকটা পাতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বা ছিঁড়েও যাচ্ছে। এই নষ্ট বা ছিঁড়ে যাওয়া পাতাগুলোকেও পরম যত্নে রেখে দিতে চাইছেন কত সন্তানহারা মায়েরা, কত মাহারা সন্তান, কত ঘরছাড়া শ্রমিক, জীবনের সব শেষ হয়ে আসা বৃদ্ধটি। তার পরেও রোজ তারা বাঁচছে, হাসছে, কাঁদছে, জানান দিয়ে যাচ্ছে তারা আছে, তাদের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো আছে। Yes present। না, কেউই আমরা শুধুই স্মৃতিতে বোধহয় বাঁচিনা, বরং স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছি নতুন ভোরের দিকে।

শ্যামলজিৎ সাহা

হলুদ বাড়ি : সবুজ পাখি

এ জীবনে কত যে বাড়ি বদল করেছি! পৈতৃক ভিটে ছেড়ে এপাড়া থেকে ওপাড়া, আবার থিতু হতে একটি চারকোণা ঘরে নামমাত্র স্থিতাবস্থা। যন্ত্রণা নিয়ে যে হলুদ বাড়িটি একদা ছেড়েছিলাম তা হয়ত ভাগ্য নিয়ন্তার বিধি ছিল। কে খণ্ডাবে? এক্ষণে আর আফসোস করার কিছু নেই; বিধাতাদেবী আড়ালে হাসেন এবং আমাদের কপালের লিখন নিয়ন্ত্রণ করেন। পরবর্তীকালে কপাল কিছুটা ধোয়ামোছা করেন আবার পালটিয়েও দেন সময়ে সময়ে। আমরা কেবল চলমান হয়ে ভালো-লাগা বা মন্দ-লাগা নিয়ে কপাল চাপড়াই বা উল্লাসে উলঙ্গ নৃত্য করি। এ প্রসঙ্গে কবি রমেন্দ্রকুমারের একটি কবিতার কথা মনে পড়ে :  

                                        বাড়ি বানালুম কেন

                                        ১

                                        ঘরে আমি থাকতে চাইনা। স্বভাব মরে না ব’লে 

                                        ফিরে-ফিরে আসি। আমি বার-বার ঠকে যাই, তবু

                                        ঘুমন্ত বালিশে আজও লতাপাতা মুখচ্ছবি আঁকি :

                                        যেন সেই ভিনগাঁর ফলের বাগানে 

                                        আমের মঞ্জরি হাতে অপেক্ষায় কেউ। আমি বাড়িতে থাকবো না।

                                        তবে বাড়ি বানালুম কেন? হরিপদ, বন্ধু, শোনো : 

                                        বাড়িতে থাকবো না বলে’ সুন্দর এ-বাড়ি বানালুম।

                                        (পূর্বপুরুষের বুকে আড়াআড়ি দুই ছোরা জ্বলে,

                                        স্বপ্ন আর হতাশায়; কী করুণ, প্রাণবন্ত তেলরঙগুলি।)

                                        ২

                                        সার্জনের হাত ফসকে পাখি-পাখি-পাখি উড়ে যায়।

কবিতায় তিনি হয়ত তাঁর আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন যেখানে তাঁর অভিষ্ট আনন্দ সম্পাদিত হয়নি, থেকে গেছে হয়ত কোথাও প্রলাপ, যন্ত্রণাবিদ্ধ না বলা গোপনচারিতা। আক্ষেপে সঙ্গ দেয় দুঃখাবহ অতীত – একবার বাসে যেতে যেতে দেখেছিলাম উত্তর কলকাতার রাজপথের ওপরে একটি ভগ্ন বাড়ির ছবি। ইঁটের খোলস জুড়ে বট-অশ্বত্থের ডালপালার বিস্তার, সর্বক্ষণ গোপন কোটরে কাঠবিড়ালির দৌড়াদৌড়ি। ট্রামের ঘড়ঘড় শব্দে বাড়ির উঠোন ও ভেতরের রঙচটা জানলা দরজা থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। এবং আমি নিশ্চিত বাড়ির উঠোনে এদিক ওদিক সাপের খোলস পড়ে আছে কোথাও বা কোটর বানিয়ে একটি পেঁচার একাকী সংসার। যেন খণ্ডহর, যেন লুপ্তির আগে দেখে নেওয়ার পালা। পুরোনো শক্তির প্রতীক হয়ে এখনও সে খাড়া থাকতে চাইছে। কিন্তু এ বাড়ির মানুষজন কোথায় গেল? কেউ নেই; মায়াহীন, আবেগহীন, অর্থহীন সব ফেলে রেখে তারা অন্যত্র উধাও। তারা ঐতিহ্য মানে না, গৌরবের মর্ম জানে না। এই নিরুপদ্রব আত্মপ্রসাদ ক্রমে ক্ষয় হয়ে চলে, সব ঐতিহ্যের ইতিহাস আর পুরোনো খিলানে রাখা কবেকার পুজোর শুকনো ফুল, একটি ভাঙা প্রদীপ, সাঁঝবাতি জ্বালানোর জন্য তেলের লাঞ্ছিত দাগটুকু শুধু পড়ে থাকে।  

আমার পুরোনো হলুদ বাড়িটি আমার পারিবারিক ঐতিহ্য। লাল ধাপি দুদিকে উঠে গেছে। ক্রমে দুটি বিশালকায় সবুজ দরজা পেরিয়ে বিস্তৃত উঠোন। চারধারে লাল বারান্দার কোলে বন্ধ হয়ে যাওয়া পুজোর স্মৃতির ঠাকুরদালান। এরই মধ্যে বসতঘর, কড়িবরগার উঁচু সিলিং, যেন উঁচু হতে হতে আকাশে মিশেছে; সেগুন কাঠের কড়িবরগায় একদা শৌখিন মানুষের লন্ঠন ঝোলানোর জন্য সাঁঝবাতি। আগে বলা হত এবাড়ি ওবাড়ি, মাঝে যোগাযোগের জন্য একটি দরজা, পুজো দেখার জন্য একটি চওড়া বারান্দা আর আড়ালে মেয়েদের দেখার জন্য থাকত চিকের ঝালর। এই বাড়ি ক্রমে আমার হাতে তৈরি হতে হতে তৃতীয় তলে পৌঁছাল। পুরোনো খিলান এখনকার শিল্পীদের হাতে সেভাবে তৈরি হতে পারল না। ঐতিহ্যের নির্মাণ স্মৃতিতেই থেকে গেল।  

সেই বাড়ি যখন আমার স্মৃতিতে কবিতাময় হতে যাচ্ছে, সেই পিতৃপুরুষের হলুদ বাড়িটি আমি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। তবুও আমি ঐতিহ্যের সঙ্গে এখনও একাত্ম হতে পারি, স্মৃতির শুভ্র পাতায় আমার কলম একটি চলায়মান দৃশ্যপট রচনা করতেই থাকে। দুই চক্ষু বুজলেই দেখতে পাই বাড়িময় ঠাকুমা মা সবার চলাচলের শব্দ, ঝগড়ার শব্দ, কলে জল পড়ার শব্দ। এই শব্দ বড়োই শক্তিশালী, খারাপ থাকার মধ্যেও ভালো থাকার নির্দেশ। স্মৃতির মন্থনে। 

সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য 

ধোঁয়া

ঠিক কোন মুহূর্তে ঝপ্ করে সন্ধ্যা নামে বোঝার জন্য চোখ খুলে রাখলে শুধু চলত না। পাঁচিলের কোণাটা কবে থেকে ভাঙা ছিল কে জানে ! প্রতি সন্ধ্যায় খেলার শেষে পা ধুয়ে ঘরে ঢোকার আগে অপেক্ষা থাকত একটা মুহূর্ত ধরার। ওই ঠিক যে মুহূর্তে ঝপ্ করে সন্ধ্যা নামে । কিন্তু চোখ নিভে যাওয়া আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুজে যেত। ওই ভাঙা কোণা থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসত ধোঁয়া। একবার চোখ কচলে, চোখ বন্ধ করলেই ওই ঝপ্ করে সন্ধ্যা হয়ে যেত। কোনোদিনই তাই জানা হল না ঠিক কোন মুহূর্তে সন্ধ্যা নামে।

জানতাম পাশের বাড়ির ওরা এইসময় উনুন জ্বালে। বাইরের উঠোনে রান্না করে। বাইরের ছোটো চাতালে বসেই খায়। ওদের বাড়িতে অনেক ক’টা ভাই বোন। বিহারের লান্জিরাম থাকে। তার তিন বউ আর অনেক ক’টা ছেলে মেয়ে নিয়ে। ওদের উঠোনে মুরগি থাকে, উঠোনের কোণায় দুটো গরুও বাঁধা থাকে। শহরে এসেও লান্জিরামের খেত খামারে ব‍্যস্ত থাকার ইচ্ছেটা কমে যায়নি হয়ত। তাই একটা ছোটো কোয়ার্টারেও এতগুলো মানুষ, পশুপাখি সবাই থাকে মিলেমিশে কখনো ঝগড়া করে।

একটা সন্ধ‍্যাও এল না যখন সেই কোণ-ভাঙা পাঁচিলের গা বেয়ে ধোঁয়া নামল না। চোখ জ্বালা করা থামল না। কোনো বৃষ্টি-বাদল-শীতের কাঁপন ওদের বাড়ির ধোঁয়াকে আটকে রাখতে পারেনি । সে সবসময়ই কুন্ডলি পাকিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে ওই ভাঙা কোণার ফাঁক পেয়ে চলে এসেছে প্রতিবেশীর ঘরে। তাই শীত গ্রীষ্ম বসন্ত সব কালের সব সন্ধ‍্যারাই ঝুপ্ করে আঁধার চাদর ফেলে দেয় চোখের ওপর। ওদের বাড়ির বাচ্চা কাঁদে, গরু ডাকে, মুরগিগুলো হুটোপুটি করতে থাকে উঠোনময়। সন্ধ‍্যে নামলেই ওদের উঠোনে যেন এক দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। 

“আমরা তোদের মতো মছলি খাই না, রোটি আর ঝাল আচার খাই” ওদের বাড়ির ছেলে ভগন বলেছিল। জিভের জল সুরুৎ করে টেনে নিতে হয় নয়ত ওদের খাবারে লোভ লাগে। কারো খাবারে লোভ দিতে নেই শিখে গেছি আগেই। অনেক ক’টা রুটি বানাতে ওদের উনোনে আগুন দিতে হয় সন্ধ্যে নামার ঠিক আগে।

একদিন সুযোগ এল। ফুরিয়ে আসা আলো সইয়ে সইয়ে চোখ তখন প্রস্তুত। এবার ঝুপ্ করে সন্ধ্যে নামবে। মা কাকটা ফিরে এসেছে ওর কোনোরকম তৈরি করা একটা বাসায়, আমগাছের ডালে বসে জানান দিল যেন ডানা গুটিয়ে। পাঁচিলের ভাঙা কোণ প্রতীক্ষায়। সাদা ধোঁয়ার মুক্তির পথটুকু তৈরি করতে পেরে যেন খুশী। কিন্তু সেদিন ধোঁয়া এল না ওদের বাড়ি থেকে এবাড়ি। একটা কান্নার ঢেউ এল সেদিন। চিৎকার করে অনেক ক’টা মানুষ কেঁদে চলেছে। বিভিন্ন সুরে। লান্জিরামের বড়ো ছেলে জগন। ক‍্যানসার হয়েছিল। মারা গেল সেই সন্ধ্যায়। সেই সন্ধ্যায় ঝপ্ করে সন্ধ্যে নেমে এল। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করল না। মৃত‍্যু এসে চোখ ভেজালো অনেকগুলো মানুষের। একসাথে। এক সন্ধ্যায়। 

সুলেখা

সুখের স্মৃতি

স্মৃতি যেন অনেকটা লক্ষ্মীর ঝাঁপি, পোঁটলা করে বেঁধে তুলে রাখা। কী নেই সেখানে! ধানের মধ্যে রাখা থাকে কড়ি, ভালো, কানা দুই অচল পয়সা, শাঁখা পলা লোহা, রঙিন চেলি, একদা মূল্যবান যা কিছু। এই লক্ষ্মীর ঝাঁপি বহন করা হয় বংশ পরম্পরায়।

স্মৃতিও তেমনই, কর্মব্যস্ত জীবনে চাপা পড়ে থাকলেও হারিয়ে যায় না সহজে। কড়ির মতো, কড়ির মূল্য বোধ করি মানুষ ভুলে যেতে চায়নি তাই তাকে যত্নে রেখেছে লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে। গোড়ার কথাকে অস্বীকার করা মানে তো সত্যকে অস্বীকার করা। মনে হয় যেন ঝাঁপিতে রাখা থাকে জীবনের রিনরিনি, রঙের ডালি, সংরক্ষিত হয় ফসলের বীজ যত্নে, শ্রদ্ধামিশ্রিত আদরে। এসবের মধ্যেই ধরা থাকে আমাদের অস্তিত্ব।

স্মৃতিও তেমন ভালোয়  মন্দে মিশিয়ে তোলা থাকে। থাকে পূর্বজদের স্মৃতিবিজড়িত গল্পকথা। আনমনে একান্তে বাঁচা জীবনের সুখ-দুঃখের বিশেষ মুহূর্তে আমরা কেবলই ফিরে ফিরে যাই স্মৃতির কাছে।

বয়স একটা কারণ কিনা জানিনা, তোরঙ্গ খুলে বসলেই অনন্ত সময় বয়ে যায় স্মৃতি হাতড়ে, বারবার ফিরে যাই অর্ধশতাব্দী পিছনে। কর্পোরেট কম্বলে শীত ভাঙে না আমার, হাতড়ে বেড়াই মায়ের ছেঁড়া কাপড়ের কাঁথার ওম। কে বলবে ছেঁড়া কাপড় ! নকশায় ঢাকা পড়ে যায় সকল জীর্ণতা। নকশার দিকে তাকালে মন চলে যায় দিদিমার ছড়মারুলির উঠানে, যেখানে পাল-পাব্বনে দিদিমার উঠুন জোড়া আলপনা। মা কি তবে মারুলি দেওয়া উঠুন না পেয়ে কাঁথায় তুলে রেখেছে দিদিমার নকশা!

মামার বাড়ির উঠোন মানেই খর রোদ্দুরে বটের ছায়ায় শিবের গাজন। ঘুগনি পাঁপড়ভাজা রঙিন কাঁচের চুড়ি রিং খেলার মেলা। চেনা অচেনা আদান-প্রদানের উৎসবমুখরিত ছুটি কাটানো। 

প্রথম কোকিলের ডাকে প্রেম নয়, আজও মন ছুটে যায় মোহনপুরের আমবাগানে দল বেঁধে দস্যিপনায়, জোড়ের জলে ঝাঁপস্নান, গামছায় মাছ ছেঁকে তোলা। বাড়ি ফিরে চরম বকুনি সেই সঙ্গে অভাবী দিদিমার গল্পকথায় লক্ষ্মী গাইয়ের দুধ (অর্থাৎ ফেনা ভাত) দিয়ে এক থালা গরম ভাত।

জীবন যখন থেমে যায়, যন্ত্রণাময় লাগে, তখন এই স্মৃতির উজান বেয়ে তিত্তিরিয়ে বয়ে চলি বেঁচে ওঠার টানে। ক্ষয়িষ্ণু এই সময়ে একটু একটু করে চারপাশ যখন বিবর্ণ হতে লাগে মনে পড়ে বাবা-কাকাদের গল্পকথা, হলুদ বাল্বের ঝিমধরা আলোয় গোল হয়ে ঘিরে হাঁ করে গিলতাম সেই সব গল্প, যে গল্পে অফুরন্ত নদী ছিল মাঠ ঘাট ফসলচাষ আর দিগন্ত জোড়া বিস্ময়, কখনও সাপ, ডাঙায় উঠে আসা মাছ এমনকী ভূতও। সেই ঘোরের মধ্যে পৌঁছে যেতাম অচেনা এক দেশে। আসলে স্মৃতি তো তাই — দেশ কাল সময় সমাজ। সমসাময়িক মানুষের স্মৃতিকথায় ধরা থাকে সময়, যাপন।

গামছায় ছেঁকে তোলা সেই স্মৃতি,যেখানে গচ্ছিত আছে আমার অস্তিত্ব আমার আনন্দ একাত্মতা, একাকীত্ব। তাকে তিনশ তো দূর, তিন হাজার শব্দে ধরাও আমার কাজ নয়, এ ব্যর্থতা মেনে নিলাম।

স্বপন ঘোষাল

অণুগল্প

আমার সেজো মাসির বাড়ি সুগন্ধ্যা, গ্রাম্য পরিবেশ আর জিলিপির স্মৃতি চিরন্তন আমার কাছে। রাস্তার ধার, টিনের ছাবড়া— আশেপাশের গাঁয়ে মাঠ থেকে ফিরে এসে কলতলায় হাত-মুখ ধুয়ে, হাতা উল্টে দলা করে রাখা জামাটা সোজা করে নিয়ে সেটাই কোনোমতে গলিয়ে একটা বাইসাইকেলে করে…

এবং এদিকে ততক্ষণে বাড়ি বাড়ি সাঁজালের যে ধোঁয়া আমের পল্লবের ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে উঠে পড়েছে এবং তাতে শেষ আলোটুকু লেগে যে বেশ মেঘ মেঘ দেখাচ্ছে…

এবং হ্যারিকেনে, লম্ফে কেরোসিন ভরা, হ্যারিকেনের কাঁচ মুছতে গিয়ে শাঁখা-পলা আর কাঁচের যে রিনরিনে বিবাদ শুরু হয়ে গেছে… 

আর সন্ধ্যা হব হব করলেও খেলতে গিয়ে এখনও ঘরে না ফেরা বাচ্চাটার জন্য উদ্বিগ্ন মায়ের পায়ে ভর করে এগিয়ে গিয়ে জোরে হাঁক পাড়া… 

আর সাইকেলের ঘন্টি, “কিগো বাজারে যাবে তো, আজকে আর বাঁধাকপি এনো না…” ইত্যাদি নিত্য-নৈমিত্তিক আলাপচারিতাকে দ্রুত পেছনে ফেলে বাইসাইকেলে মানুষগুলো এগিয়ে যেত। 

এবং দরদাম হাঁকডাক কথা কাটাকাটি, তারপর সেসব মিটিয়ে-টিটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বা এই বাজার সারার ফাঁকেই সেই রাস্তার ধার, টিনের ছাবড়ির নীচে প্যাঁচে প্যাঁচে রসে ভরে ওঠা গরম মুচমুচে এই অলঙ্ঘ্য আকর্ষণে টুক করে ঢুকে পড়া— 

“দু’টো গরম গরম দাও দেখি…”

আর তারপরেই মনে পড়ত বাড়ির কথা, সন্তানের কথা,

সন্তানদের মায়ের কথা, এবং…

 “দ্যাও দুশো প্যাক করে, নিয়ে যাই…”

মাঠ থেকে ফেরা আছে

সাঁজাল নেই, 

বাইসাইকেলে চাপা অনেক কমে গেছে,

এখন বাইক, স্কুটি, অটো, টোটো

মাঠ থেকে খেলে ফিরতে দেরি হওয়া নেই,

কারণ খেলা নেই,

সাঁজাল নেই, কারণ সেই গোয়াল আর নেই, 

সন্ধ্যায় প্রদীপ ধরানো কাঁচ মোছা তেল ভরা নেই, এখন বিজলি বাতি,

পিছুডাক, হাঁকডাক, তর্কাতর্কি কমই আছে,

সবই আগে থেকে গোছানো

টিনের ছাবড়ি নেই বললেই চলে

দোকান আছে,

রাস্তা নেই বললেই চলে

রাস্তার ধার আছে,

দ্রুত বাজারের দিকে ধেয়ে চলা লুঙ্গির উপরে দোমড়ানো শার্ট পরা লোকজন আছে,

পোশাকগুলো পাল্টে গেছে,

পাকে পাকে প্যাঁচে প্যাঁচে রসে ভরে ওঠা তীব্র আকর্ষণ এখনও রয়ে গেছে

“পাঁচশ গ্রাম ভালো দেখে প্যাক করে দিন তো”।

সত্যি আমার এই স্মৃতির স্বাদের ভাগ হবে না। সম্পূর্ণ স্বাদ আমার এবং স্মৃতি আজও বহমান।

হিন্দোল পালিত

নবারুণ ভট্টাচার্যের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ: স্মৃতি, রাজনীতি ও তারুণ্যের গল্প

পশ্চিমবাংলার বাতাস তখন ভারি। কৃষি বনাম শিল্প, জমি অধিগ্রহণ, কর্মসংস্থান ইত্যাদি শব্দগুলো ধিকিধিকি জ্বলছে। সদ্য কলেজ-গামী, ব্রণময় কৈশোর এক অনিশ্চিত সাঁকোয় দুলছে। সে একটি অবলম্বন খুঁজছে। কোনো কিছু জাপটে ধরে বাঁচতে চাইছে। ঠিক এমন সময়ে আমার জীবনে নবারুণ ভট্টাচার্যের উল্কান্যায় প্রবেশ। বইয়ের প্রতি আমার স্বাভাবিক অনুরক্তি দেখেই আমার ছোটোদাদু ‘লুব্ধক’ উপন্যাসটি পড়তে দেন। নাতিদীর্ঘ এই উপন্যাস পাঠের পর বুঝি, আমার স্বল্প পাঠক জীবনে এর চেয়ে মহৎ, এর চেয়ে উদ্দীপক আমি কিছু আর পড়িনি। এই কুকুর-উপকথা যেন সমসময়ের আয়না, যাতে পশ্চিমবাংলার তৎকালীন রাজনীতির উলম্ব ছায়া এসে পরে। কোনো কিছু না ভেবেই, অত্যন্ত অপরিণত আমি নবারুণ ভট্টাচার্যের এই উপন্যাসের একটি নাট্যরূপ দিই। আমরা কয়েকজন স্থানীয় বন্ধু ঠিক করি যে আমরা এই নাটকের মঞ্চায়ন করব। আজ এতো বছর বাদে ফিরে দেখলে নিজেদের অবিমৃশ্যকারীতার ( এবং দুঃসাহসিকতা) কথা ভাবলে কিঞ্চিৎ লজ্জাবোধ হয়। সেদিন তারুণ্যের প্রাবল্যে, যাবতীয় বাস্তববোধ খুইয়ে, আমরা আনাড়ি ক’জন এই কাজটি করে বসেছিলাম। সবচেয়ে অবাক কথা- স্বয়ং লেখক আমাদের এই অর্বাচীনতাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। আমার সেই ছোটোদাদু’ই নবারুণ ভট্টাচার্যের ফোননম্বরটি জোগাড় করে দিয়েছিলেন। কম্পিত বক্ষে ফোনটা আমিই করি। ওপারে একটু ধরা গলার নবারুণ। অবাক কাণ্ড, সম্পূর্ণ নবীন দল ( আমাদের দলের রেজিস্ট্রেশনটুকু ছিল না) তাঁর লেখা থেকে নাটক করতে চাইছে শুনে, বিরক্ত তো হলেনই না বরং বললেন, ‘বেশ তো, নিজেরা বন্ধুরা মিলে নাটকটা করো না’। পরবর্তী সময়ে বুঝেছি, যে শিল্প কিছু স্থানিক, বাহুল্যহীন, তিনি তার পাশে দাঁড়াতেন। বরং আঙ্গিকসর্বস্ব, বৃহৎ স্পেকট্যাকেল-ধর্মী কোনো কিছুর থেকে তিনি ছোঁয়াচ বাঁচিয়েই চলতেন। সাহস পেয়ে তাঁকে একটা প্রশ্ন করেই ফেললাম- ‘আচ্ছা, উপন্যাসে বৃদ্ধ সারমেয়রা কেন সবার আগে পরিবর্তনের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিল?’ একটু থামলেন। এরপর বললেন, ‘যে কারণে তোমার দাদু তোমাকে এই বইটি পড়তে দিয়েছেন’। এই উত্তরের ব্যাপ্তি অনেক বছর বাদে আমি বুঝেছিলাম। 

আমাদের সশরীরে সাক্ষাৎ বছর খানেক বাদে। জানলাম কলকাতার এক প্রথিতযশা দল ওঁর ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ উপন্যাসটি মঞ্চায়ন করবে। নকশাল আমলে, পুলিশি টর্চারে মানসিক ভারসাম্য-হারানো রণজয় আজও অসমাপ্ত লড়াইটা লড়ছে। উপন্যাসটির মঞ্চায়ন আমার একদম পছন্দ হয় নি। ছেলেমানুষিতে ভরা, আবেগ-সর্বস্ব, নিষ্ফলা লাগে পুরো ব্যাপারটা। নাটক শেষে নবারুণ যখন একাডেমীর বাইরের তন্বী পথটা ধরে হাঁটছেন, আমি সটান সেকথা গিয়ে ওঁকে বললাম। শুনে স্মিত হাসলেন। কোনো কথা না বলে এগিয়ে গেলেন। ওই আমার প্রথম ও শেষ নবারুণ-দর্শন।

নবারুণ ভট্টাচার্য চলে গেলেন ২০১৪’তে। ২০১৭’তে আমি শুরু করলাম আমার প্রাথমিক গবেষণার কাজ। বিষয়: নবারুণ সাহিত্যে স্মৃতি-প্রতিরোধ। এই সম্পূর্ণ বিকিয়ে যাওয়া সময়ে, যেখানে হেরে যাওয়াটাই একমাত্র ভবিতব্য, স্মৃতি ছাড়া আর বিকল্প বর্ম কোথায়? ওরা আমাদের সবটুকু কেড়ে নিয়েছে। পরে আছে শুধু ফেলে আসা সময়ের কিছু স্মৃতি-সংহিতা। তখন আমাদের পবিত্র রাগ ছিল, রক্তে গনগনে আঁচ ছিল, ভালোবাসা বিজ্ঞাপন-বিহীন ছিল। নবারুণের সাহিত্যে বারবার আসে এই স্মৃতি- প্রতিরোধের কথা। এটা নিছক আলসে স্মৃতি-মেদুরতা নয়। বরং তার চেয়ে ঢের প্রগাঢ়, দ্যোতনাপূর্ণ। পুরোনো সময়ের বিস্ফোরক সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে আপাত-নির্জীব বর্তমানে।  ‘হারবার্ট’ উপন্যাসের শেষে বিস্ফোরক-বোঝাই তোষক চুল্লি উড়িয়ে দেয়। ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’র রণজয় কলকাতার গরমে স্তালিনগ্রাদের বরফকে অনুভব করে। ‘লুব্ধক’ উপন্যাসে কুকুর-উপকথাকে সত্যি করে মিশরীয় অনুবিস সারমেয়দের প্রতিস্পর্ধী লং মার্চকে নেতৃত্ব দেয়। ঠিক একইভাবে আমার মননে-চৈতন্যে সবটুকু জড়িয়ে থাকেন স্মৃতি-যোদ্ধা নবারুণ ভট্টাচার্য। তাঁকে বিস্মৃত হলে আমার সম্পূর্ণ গোল্লায় যাওয়া সম্পন্ন হবে।

অলংকরণ – অহনা ভট্টাচার্য